ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন

পুকুর-ডোবা ভরাট করে বাস টার্মিনাল

বৃষ্টি হলেই বালুচরা, কুলগাঁও, জালালাবাদে জলাবদ্ধতা

পুকুর-ডোবা ভরাট করে বাস টার্মিনাল
×

জলাধার ভরাট করে বাস টার্মিনাল নির্মাণ করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। সম্প্রতি তোলা সমকাল

 আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৪ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৬ | ১১:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

তিনটি বিশাল পুকুর ও ডোবা ভরাট করে নতুন সিটি বাস টার্মিনাল তৈরি করছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। যেখানে জলাবদ্ধতায় নাকাল চট্টগ্রাম নগরের লাখ লাখ মানুষ, সেখানে খোদ চসিক বিশাল জলাধার ভরাট করেছে। এই জলাধার ভরাট করার খেসারত দিচ্ছেন নগরের কুলগাঁও, বালুচরা, জালালাবাদ এলাকার প্রায় তিন লাখ মানুষ। এবারের বৃষ্টিতে বৃহত্তর এ এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ডুবে যায় কুলগাঁও শেরেবাংলা সড়ক, ট্যানারি বটতল সড়কসহ আশপাশের ঘরবাড়ি। আগে বৃষ্টি হলে পুকুর ও ডোবায় পানি নেমে গেলেও এখন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে সেই পানি সড়ক ও মানুষের বাড়িঘরে ঢুকে যাচ্ছে। 

চট্টগ্রাম নগরীর তিনটি মূল প্রবেশমুখের একটি অক্সিজেন মোড়। এ মোড়ের যানজট নিরসনে ২০১৮ সালে কুলগাঁও এলাকায় বাস টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয় চসিক। এরপর জমি অধিগ্রহণসহ বিভিন্ন জটিলতায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করা যায়নি। ২০২৪ সাল থেকে সিটি বাস টার্মিনালের কাজ শুরু হয়। নগরের কুলগাঁও সিটি করপোরেশন কলেজের পাশেই এ টার্মিনাল তৈরি হচ্ছে তিন দফা সময় বাড়িয়ে, বিশাল জলাধার ভরাট করেই। এখন অবকাঠামোগত কাজ শেষ। এ বছরই বাস টার্মিনাল চালু হবে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাস টার্মিনালটি নির্মাণের আগে বৃষ্টি হলেই নিচু জায়গা ডোবা ও বড় বড় পুকুরে পানি চলে যেত। এটি ছিল কুলগাঁওসহ বিস্তীর্ণ এলাকার বড় জলাধার। এটি থাকায় কুলগাঁওসহ আশপাশে বড় কোনো জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো না। কিন্তু বাস টার্মিনালের অবকাঠামোর কাজ যত শেষ হতে থাকে, ততই জলাবদ্ধতা সমস্যা টের পেতে শুরু করেন স্থানীয় মানুষ। এবার জলাবদ্ধতার সমস্যা প্রকট হওয়ায় এ জলাধার ভরাটকেই দায়ী করছেন তারা। মাটি ও বালু দিয়ে ডোবা ও পুকুর ভরাট করা হয়েছে। 

চসিক ২৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮ দশমিক ১০ একর জায়গার টার্মিনালে ১৬০টি বাস-ট্রাক পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকছে। টার্মিনালের প্রবেশপথে একটি তিনতলা ভবন, একটি সিটি বাস টার্মিনাল, একটি আন্তঃনগর বাস টার্মিনাল, ২৫টি যাত্রী বোর্ডিং লেন, ১৪টি অতিরিক্ত ওয়েটিং লেন, একটি খোলা হলরুম এবং তথ্যকেন্দ্র, পুরুষ ও নারীদের জন্য টয়লেট, ২২টি টিকিট কাউন্টার, যাত্রী, বাস-ট্রাক মালিক এবং বাস কর্মচারীদের আবাসনসহ নানা সুবিধা থাকছে। এখান থেকে চট্টগ্রামের উত্তরাঞ্চলের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, হাটহাজারী, নাজিরহাট, ফটিকছড়ি, রাউজান, রাঙ্গুনিয়াসহ ৩২টি রুটে বাস চলাচল করবে। প্রতিদিন চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড় থেকে চার-পাঁচশ বাস চলাচল ও লক্ষাধিক মানুষ যাতায়াত করেন। যাত্রীদের জন্য নতুন বাস টার্মিনাল নির্মাণ স্বস্তির খবর হলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এটি এখন ভোগান্তির আরেক নাম।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, যে কোনো ধরনের জলাধার ভরাট করা পরিবেশ ধ্বংসের শামিল। ফলে ডোবা, পুকুর ভরাট করা সম্পূর্ণ নিষেধ এবং এটি দণ্ডনীয় অপরাধ। 

কুলগাঁও শেরেবাংলা নগর এলাকার বাসিন্দা রাজ্জাকুল হায়দার বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিশাল ডোবা ও তিনটি বড় পুকুর ভরাট করে এ বাস টার্মিনাল তৈরির কাজ শুরু হয়। এটি এখন আমাদের কপালে দুর্ভোগ নিয়ে এসেছে। আগে বৃষ্টি হলেই কুলগাঁও, অক্সিজেন, ট্যানারি বটতল, জালালাবাদ এলাকার পানি বাস টার্মিনালের বিশাল জলাধারে চলে যেত। এখন সেখানে পানি যাওয়ার জায়গা বন্ধ হওয়ায় সেই পানি ঢুকছে আমাদের ঘরবাড়িতে। 

জালালাবাদ এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী শওকত আলী বলেন, আমার পাঁচতলা বাড়ি। আগে কখনও নিচতলায় পানি ওঠেনি। এবার নিচতলায় পানি ঢুকেছে। এর জন্য দায়ী সিটি করপোরেশন। এ বিচার দেব কার কাছে?

পরিবেশ আন্দোলনকর্মী শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, রক্ষক এখানে ভক্ষকের ভূমিকায়। চসিক যেখানে মানুষকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দেবে, সেখানে জলাধার ভরাট করছে। এটি সত্যিই দুঃখজনক। 

পরিবেশ অধিদপ্তর-চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক মুক্তাদির হাসান বলেন, পুকুর-ডোবা ভরাট করে বাস টার্মিনাল তৈরির জন্য সিটি করপোরেশন পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে কোনো অনুমতি নেয়নি। আইনে যেহেতু পুকুর-ডোবা ভরাট নিষিদ্ধ; আমরা বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।  

এ প্রসঙ্গে চসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) মোহাম্মদ রিফাতুল করিম চৌধুরী বলেন, চসিকের কুলগাঁও বাস টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে। এটি চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি মহাসড়কের মূল ভূমি থেকে ১২-১৩ ফুট গভীর ছিল। উত্তর চট্টগ্রামের জন্য কোনো বাস টার্মিনাল না থাকায় পুকুর ও ডোবা ভরাট করেই বাস টার্মিনালটি তৈরি করতে হয়েছে। 

জলাবদ্ধতা সৃষ্টি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন পরিস্থিতি এমন– একটি কাজ করলে আরেক সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। পুকুর-ডোবা ভরাট করায় জলাধার ভরাট হয়েছে সত্য। তবে ওখানে থাকা দুম্বার খালটি দখলমুক্ত করে পুরোপুরি সচল করলে নতুন করে যে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে, তা দূর হয়ে যাবে। 

 

আরও পড়ুন

×