ঢাকা সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

পাবনায় প্রতিবন্ধীকে ধর্ষণচেষ্টা, সালিশে ‘জুতাপেটা’ করে মীমাংসার চেষ্টা

পাবনায় প্রতিবন্ধীকে ধর্ষণচেষ্টা, সালিশে ‘জুতাপেটা’ করে মীমাংসার চেষ্টা
×

ধর্ষণচেষ্টার অভিযুক্তকে সালিশে জুতাপেটার পর মীমাংসা করা হয়। ছবি-সংগৃহীত

সাঁথিয়া (পাবনা) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ | ২০:১৯

পাবনার সাঁথিয়ায় এক বুদ্ধি ও বাকপ্রতিবন্ধী নারীকে (৩০) ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। তবে অপরাধের বিষয়টি থানা পুলিশকে না জানিয়ে স্থানীয়দের উপস্থিতিতে গ্রাম্য সালিশে ধর্ষণচেষ্টার অভিযুক্ত ওই ব্যক্তিকে ২০ জুতাপেটার পর মীমাংসার অভিযোগ উঠেছে। গুরুতর অভিযোগে আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তির ঘটনায় এবং এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ পাওয়ার পর এলাকায় ব্যাপক সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

ভুক্তভোগীর পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার (৮ জুলাই) দুপুর দুইটার দিকে উপজেলার গৌরীগ্রাম ইউনিয়নের হারিয়াকাহন গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত মহব্বত আলী খাঁ (৪৫) ওই গ্রামের মৃত তায়জাল খাঁর ছেলে।

ঘটনার দিন ওই প্রতিবন্ধী নারীকে বাড়িতে একা রেখে তার মা পাশে ছেলের বাড়িতে যান। এই সুযোগে মহব্বত আলী ঘরে ঢুকে ওই নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। এ সময় প্রতিবন্ধী নারীর গোঙানি ও চিৎকার শুনে তার মা ও প্রতিবেশীরা ছুটে এলে মহব্বত আলী পালিয়ে যান।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঘটনাটি পুলিশকে না জানিয়ে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল চার দিন ধরে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালায়। সর্বশেষ রোববার সন্ধ্যায় হারিয়াকাহন এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য মালেক মণ্ডলের বাড়ির উঠানে এক গ্রাম্য সালিশের আয়োজন করা হয়।

জানা যায়, ইউপি সদস্য মিল্টন, আরশেদ আলী ও আব্দুল মালেকসহ স্থানীয় মাতব্বরেরা এই সালিশে উপস্থিত ছিলেন। সালিশে অপরাধ স্বীকার করায় অভিযুক্ত মহব্বত আলীকে শারীরিক শাস্তি হিসেবে ‘২০টি জুতার বাড়ি’ দেওয়ার রায় দেওয়া হয়। সেখানেই এই বিচারকার্য সম্পন্ন করে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ধর্ষণচেষ্টার মতো গুরুতর অপরাধকে জুতার বাড়ি দিয়ে মীমাংসা করা দেশের প্রচলিত আইনকে অমান্য করার শামিল। ভুক্তভোগী পরিবারটি সহজ-সরল ও আইন সম্পর্কে কম বোঝায় জনপ্রতিনিধিরা সালিস করেছেন। 

ভুক্তভোগী প্রতিবন্ধী নারীর দুলাভাই মহরম আলী বলেন, ‘মহব্বত এর আগেও দুই জায়গায় একই অপরাধ করেছে। আমার শ্যালিকার ঘটনায় শনিবার সালিস বসার কথা থাকলেও আসামি আসেনি। রোববার সালিশের শুরুতে আসামিকে ৭টি জুতার বাড়ি ও জুতার মালা পরিয়ে রাস্তায় ঘোরানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু পরে শুধু ২০টি জুতার বাড়িতে রফাদফা করা হয়।’

তিনি আরও বলেন, একজন অসহায় প্রতিবন্ধী নারীর ইজ্জতহানির বিচার কি শুধু ২০টি জুতার বাড়ি? আমি এই অন্যায় রায় না মেনে সালিস থেকে চলে এসেছি। আমাদের থানায় যেতে এখনও বাধা দেওয়া হচ্ছে। আমরা কোনো টাকা-পয়সা চাই না, অন্যায়ের সঠিক বিচার চাই। সবার সঙ্গে আলোচনা করে আমরা আইনের দ্বারস্থ হবো।

সালিস বোর্ডে উপস্থিত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে ইউপি সদস্য আরশেদ আলী বলেন, ‘আমি এই আইনটি জানি না। ওটা আমার ওয়ার্ডও না।’

গৌরীগ্রামের ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল ওহাব বলেন, আমি সাঁথিয়ায় একটি অনুষ্ঠান শেষে বাড়ি ফেরার পথে আমাকে ওই সালিশে ডাকা হয়েছিল। গিয়ে দেখলাম দুই পক্ষের আত্মীয় স্বজনরা বসে সালিশের রায় করেছে এবং বিষয়টি সমাধান করেছে। তবে শুনেছি সালিশে ওই ছেলে তার অপরাধ স্বীকার করেছে। 

এ বিষয়ে সাঁথিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিসুর রহমান জানান, ভূক্তভোগী ওই নারীর বড় ভাই বাদী হয়ে থানায় মামলা করেছেন। আসামি পলাতক রয়েছে এবং আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। 

সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রিজু তামান্না বলেন, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী ধর্ষণ বা ধর্ষণচেষ্টা একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধের বিচার কোনোভাবেই গ্রাম্য সালিশে করার সুযোগ নেই। আইন অমান্য করে জনপ্রতিনিধিরা কেন এটি করলেন, তা জানতে চেয়ারম্যানকে ডাকা হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার নজরে এসেছে। এরপরই তিনি ওসিকে খোঁজ নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ভুক্তভোগী পরিবারটি যাতে সঠিক বিচার পায়, তা নিশ্চিত করা হবে। 

আরও পড়ুন

×