সুতা বেচাকেনার আড়ালে চলে চায়না দুয়ারি জাল বিক্রি
শিবালয়ের বোয়ালীর ফসলি মাঠে পেতে রাখা চায়না দুয়ারি জাল। গতকাল বৃহস্পতিবার তোলা সমকাল
নিরঞ্জন সুত্রধর, শিবালয় (মানিকগঞ্জ)
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৯:০২
| প্রিন্ট সংস্করণ
মানিকগঞ্জের শিবালয়ের খাল, বিল, ফসলি মাঠের পানিতে খেয়াল করলেই নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জাল চোখে পড়ে। তবে প্রকাশ্যে কোথাও এটি বিক্রি হতে দেখা যায় না। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সুতা বেচাকেনার আড়ালে এ জাল বিক্রি করছেন। কিন্তু উপজেলা প্রশাসনের এ নিয়ে কোনো তৎপরতা নেই।
বর্ষা মৌসুমে উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে মিলছে দেশীয় পোনা মাছ। স্থানীয়রা বলছেন, এসব মাছ একশ্রেণির মৌসুমি জেলে চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে ধরছেন। বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপজেলার খালবিল, ফসলি মাঠের পানিতে তারা চায়না দুয়ারি জাল পাতা শুরু করেছেন। এতে নির্বিচারে পোনা মাছসহ মা মাছ ধরা পড়ছে।
উলাইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান বলেন, মৌসুমি জেলেরা চায়না দুয়ারি জাল দিয়ে মাছের ডিম থেকে শুরু করে সব ধরনের মাছ বিক্রি করায় এখন পুকুরেও মাছ ঢোকে না। উপজেলার জমদুয়ায়া গ্রামের আলম শেখ বলেন, আগে বর্ষা মৌসুমে ফসলি মাঠের বা বিলের অনেক মাছ পুকুরে ঢুকত। এখন মৌসুমি জেলেরা ফসলি মাঠে পানি আসার সঙ্গে সঙ্গে চায়না দুয়ারি দিয়ে পোনা মাছ ধরে বিক্রি করায় কোনো মাছ আসে না। প্রশাসন যদি নিয়মিত অভিযান চালায় বা এ জালের বিরুদ্ধে মাইকিং করে, তাহলে এভাবে মাছ ধরা অনেকটাই বন্ধ হয়ে যাবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন মৌসুমি জেলে বলেন, আরিচা মাছ বাজারের জালাল শেখ, সাইম শেখ, আসলাম ও মাইনুলসহ ছয়-সাতজন ব্যক্তি অবাধে প্রতিদিন চায়না জাল বিক্রি করছেন। সাধারণত কেউ এ জাল বিক্রি করতে বাধা দিতে গেলে তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়। এ কারণে কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পান না।
যোগাযোগ করা হলে তারা সবাই চায়না দুয়ারি জাল বিক্রির কথা অস্বীকার করেন। চায়না দুয়ারি জাল বিক্রেতা মুরাদ মোল্লা বলেন, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তারা আমার চায়না দুয়ারি আটকের পর আমি এ ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছি। জালাল শেখ বলেন, এলাকায় বর্ষা কম হওয়ায় চায়না দুয়ারি তেমন চলে না। এ কারণে এখনও এ জাল আনিনি। আসলাম ও সাইম বলেন, আমরা চায়না দুয়ারি বিক্রি করা বন্ধ করে দিয়েছি। যারা আমাদের কাছ থেকে আগে জাল নিত, তারা এখনও আমাদের নাম বলে।
সূত্র জানায়, উপজেলার নয়াবাড়ী, জাফরগঞ্জ, নালী, আমডালা, বরংগাইলসহ বিভিন্ন হাটবাজারে গোপনে সুতা বিক্রির আড়ালে চায়না দুয়ারি জাল বিক্রি করা হচ্ছে। আমডালা বাজারের দোকানি নয়ন মোল্লা বলেন, উপজেলার শিবালয়, জাফরগঞ্জ, তেওতা, ষাইট ঘর তেওতা, ববংগাইল, নয়াবাড়ী, উথলী, আমডালাসহ বিভিন্ন হাটে অবাধে বিক্রি হচ্ছে চায়না দুয়ারি জাল। এ জালের ব্যবসায়ীরা দোকানে মূলত বিভিন্ন পদের সুতার জাল বিক্রি করেন। আর চায়না দুয়ারি জাল রাখা হয় বাড়িতে। কেউ কেউ নিরাপদ স্থানে দোকান ভাড়া নিয়ে চায়না দুয়ারির গোডাউন বানিয়ে রেখেছেন। সুতার দোকানে চায়না দুয়ারি ক্রেতা এলে দামদর মিটিয়ে গোডাউনে বা বাড়িতে ক্রেতাদের টোকেন দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে থাকা লোকজনকে ক্রেতাদের কত পিস জাল দিতে হবে, তা ফোন দিয়ে বলে দেন। কয়েকজন চায়না দুয়ারির ক্রেতাও এ তথ্য জানিয়েছেন। মৌসুমি মাছ শিকারিরা ২২০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০-১২ হাজার টাকা দিয়ে এ জাল কেনেন।
এক চায়না দুয়ারি বিক্রেতা বলেন, আমরা অনেকেই ম্যানেজ করে এটি বিক্রি করছি। এ কারণে আমাদের তেমন ঝামেলা হচ্ছে না।
এ ব্যাপারে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাথী রানী নিয়োগী বলেন, প্রায় এক মাস আগে আরিচার ফরহাদ মোল্লার প্রায় ৫ লাখ টাকা মূল্যের চায়না দুয়ারি জাল আটক করে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়। আমরা আবার অভিযান চালাব। উপজেলার বিভিন্ন খালবিলেও অভিযান চালানো হবে।
শিবালয় থানার ওসি মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, চায়না দুয়ারির বিষয়টি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তারা দেখেন। তারা এ জাল উদ্ধারের ব্যাপারে আমাদের সহযোগিতা চাইলে, আমরা তা করব। এখন পর্যন্ত মৎস্য কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে আমাদের কিছু বলেননি। এ ছাড়া আমাদের কাছে চায়না দুয়ারি বিক্রির সংবাদ এলে অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করব। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনীষা রানী কর্মকার বলেন, দেশীয় মাছ রক্ষায় চায়না জাল ও এর ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে।
- বিষয় :
- মাছ ধরা