ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

বগুড়ায় টানা বর্ষণ

ফসল নষ্টের প্রভাব বাজারে তিন সংকটের আশঙ্কা

তলিয়েছে ৪১৭ হেক্টর কৃষিজমি

ফসল নষ্টের প্রভাব বাজারে তিন সংকটের আশঙ্কা
×

বগুড়া সদরের শাখারিয়া দক্ষিণপাড়ায় নষ্ট হয়ে যাওয়া করলা ক্ষেত সমকাল

লিমন বাসার, উত্তরাঞ্চল

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ০৮:০৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

মাঠে জমে থাকা বৃষ্টির পানি শুধু কৃষকের ফসলই ভাসিয়ে নেয়নি, তার প্রভাব পড়েছে কাঁচাবাজারেও। টানা বৃষ্টিতে বগুড়ার অন্তত ৪১৭ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর উৎপাদন ও সরবরাহে ধাক্কা লেগেছে। এর প্রভাবে এক সপ্তাহেই বিভিন্ন সবজির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রায় পাঁচ হাজার কৃষক। সামনে আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস থাকায় উৎপাদন, বাজার ও ভোক্তা–তিন দিক থেকেই নতুন সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

অতিবৃষ্টিতে ডুবল ৪১৭ হেক্টর জমি
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির সর্বশেষ প্রতিবেদনে এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। চলতি জুলাই মাসের শুরু থেকেই জেলাজুড়ে দফায় দফায় ভারী বর্ষণ শুরু হয়। বিশেষ করে ১, ২ এবং ৬ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত চলা টানা বৃষ্টিতে জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে ৭টি উপজেলাই বন্যাকবলিত রূপ নিয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, ইতোমধ্যে এই সাত উপজেলার প্রায় ৪১৭ হেক্টর ফসলি জমি সম্পূর্ণ পানিতে তলিয়ে গেছে; যার ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৪ হাজার ৯৬১ জন কৃষক। বগুড়া আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, চলতি মাসের প্রথম তেরো দিনেই জেলায় ৩০৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে কেবল ৯ জুলাই ১০৯ দশমিক ৮ মিলিমিটার এবং ১৩ জুলাই ১০৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, যা চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ রেকর্ড। 

সারিয়াকান্দিতে সর্বোচ্চ বিপর্যয়
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আবাদি জমি নিমজ্জিত হওয়ার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে সারিয়াকান্দি উপজেলা। যমুনা বিধৌত এই অঞ্চলের প্রায় ১৮৮ হেক্টর জমি এখনও পানির নিচে। এছাড়া কাহালুতে ৭৫ হেক্টর, দুপচাঁচিয়ায় ৫৫, আদমদীঘিতে ৪৫, সোনাতলায় ৩৮, শিবগঞ্জে ১৭ এবং শাজাহানপুরে ১৪ হেক্টর জমি নিমজ্জিত হয়েছে। ফসলভিত্তিক ক্ষতির চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মৌসুমের জন্য তৈরি করা আমনের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১২৬ হেক্টর। এছাড়া ১১৫ হেক্টর পাট, ১০৬ হেক্টর সবজি, ৩৪ হেক্টর আউশ ধান, ২৩ হেক্টর মরিচ এবং অন্যান্য ফসল ১৩ হেক্টর জমির ক্ষতি হয়েছে। কৃষিকর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই জলাবদ্ধতা যদি আরও কয়েক দিন স্থায়ী হয়, তবে এসব জমির ফসল আর কোনোভাবেই উদ্ধার করা সম্ভব হবে না।

সবজিচাষিদের স্বপ্নভঙ্গ ও গাছ পচন
বগুড়ায় চলতি মৌসুমে ৬ হাজার ৭৫১ হেক্টর জমিতে সবজির আবাদ হলেও অতিবৃষ্টির প্রথম ধাক্কাতেই ১০৬ হেক্টর ক্ষেত সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১ হাজার ৩৭৭ জন সবজিচাষি। উপজেলাভিত্তিক হিসাবে সবজিক্ষেত ডোবার ক্ষেত্রেও কাহালুতে ৪৫ হেক্টর ও সারিয়াকান্দিতে ২৮ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে মাঠের বাস্তব চিত্র সরকারি এই খতিয়ানের চেয়েও অনেক বেশি উদ্বেগজনক বলে দাবি করছেন ভুক্তভোগী কৃষকেরা। ক্ষেত থেকে সবজি তোলার ঠিক আগমুহূর্তে এই দুর্যোগ আসায় মূলধন হারানোর শঙ্কায় দিন কাটছে তাদের। 
বগুড়া সদরের শাখারিয়া দক্ষিণপাড়া এলাকার করলাচাষি সুভাষ মোদক নিজের ক্ষোভের কথা জানিয়ে বলেন, করলা চাষে প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ করেছিলেন। বিক্রি শুরুর আগেই পুরো ক্ষেত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন সব খরচই লোকসান। একই এলাকার ক্ষিতীশ কর্মকার জানান, ১৪ শতক জমিতে লাউ ও কুমড়া চাষে ৮ হাজার টাকা ব্যয় করলেও অতিবৃষ্টিতে মাচা ভেঙে সব গাছ পচে গেছে। অন্যদিকে গত বছর লাভ করলেও এবার কচু চাষে ৩০ হাজার টাকা খুইয়েছেন কালিবালা এলাকার কৃষক শামছুর রহমান। নতুন করে বিনিয়োগের কোনো পুঁজি এখন এই কৃষকদের হাত নেই। 
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি সহায়তা বা প্রণোদনা দেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান জানান, ‘ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। মন্ত্রণালয়ে জরুরি বরাদ্দের জন্য প্রস্তাব পাঠানো হবে। পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সঠিকভাবে প্রণয়ন ও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা যেন দ্রুত বীজ, সার ও আর্থিক প্রণোদনা পান, তা নিশ্চিত করা হবে।’

কাঁচাবাজারে আগুন, দিশেহারা ক্রেতা
মাঠের এই ধ্বংসযজ্ঞের সরাসরি প্রভাব পড়েছে শহরের রাজাবাজার, ফতেহ আলীবাজারসহ বিভিন্ন খুচরা বাজারে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে কাঁচামরিচের দাম, যা ৬০ টাকা থেকে সরাসরি ১২০ টাকায় ঠেকেছে। এছাড়া ঝিঙ্গা ও বরবটি ৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ টাকা, বেগুন ৮০ থেকে ১০০ টাকা, ঢ্যাঁড়শ ৪০ টাকা এবং লাউ ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় আলুর দাম ২৫ থেকে বেড়ে ৪০ টাকা এবং আদা ১৬০ টাকায় উঠেছে। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে টমেটোর দাম ৩০০ থেকে কমে ১৬০ টাকায় নেমেছে। 
রাজাবাজারের সবজি বিক্রেতা আব্দুস সোবাহান জানান, মোকাম থেকে পর্যাপ্ত সবজি না আসায় এবং পরিবহনে সমস্যার কারণে তাদের বাধ্য হয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। ফতেহ আলী বাজার বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক আতিকুর রহমান আতিক বলেন, মাঠে ফসল নষ্ট হওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমেছে এবং সে কারণেই এই মূল্যবৃদ্ধি। বাজারের এই অস্থিরতায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষ। বাজারে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী রানা মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রতিদিন বাজারে এসে নতুন দামের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, সংসার চালানো এখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শঙ্কায় কৃষি বিভাগও
বর্তমান পরিস্থিতি এবং আগামী দিনের বাজারব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে জেলা কৃষি বিভাগও। মাঠের পানি দ্রুত না নামলে এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোহেল মো. শামসুদ্দীন ফিরোজ পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্বীকার করে বলেন, চলতি মৌসুমে শাকসবজির আবাদের ভালো লক্ষ্যমাত্রা ছিল। ইতোমধ্যে ১০৬ হেক্টর জমির সবজি নষ্ট হয়েছে। এখন যদি দ্রুত বৃষ্টি কমে যায়, তবে কৃষকেরা কিছু ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী যদি আবারও ভারী বর্ষণ হয়, তবে ক্ষতির পরিমাণ এবং বাজারের অস্থিরতা দুটিই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়তে পারে। 
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বগুড়ার সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মেহেদী হাসান 
বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে সরবরাহ কমায় দাম কিছুটা বেড়েছে ঠিক, তবে এই সুযোগে কোনো অসাধু ব্যবসায়ী যেন কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা লুটতে না পারে, সেজন্য বাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হবে।’

আরও পড়ুন

×