ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

‘জাহাঙ্গীরের আত্মাটা এখনও যায় নাই?’

‘জাহাঙ্গীরের আত্মাটা এখনও যায় নাই?’
×

জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর

কিশোরগঞ্জ ও মিঠামইন প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৩:২৪ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৫:১০

কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলা বিএনপির (পদ স্থগিত) সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর (৫৭) হত্যার ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। ভাড়াটে তিন ব্যক্তির মাধ্যমে গত বুধবার রাতে তাঁকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোকাররম হোসেন খোকাসহ আরও কয়েকজনের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। 

গত শুক্রবার রাতে থানায় হত্যা মামলা করেছেন জাহাঙ্গীরের স্ত্রী তসলিমা আক্তার চৌধুরী। এতে মো. হেলাল (২৪), মহিন উদ্দিন (৩২) ও মো. শাহিন ওরফে শাকিলের (২৭) নাম উল্লেখসহ ১০-১২ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে হেলাল ঘটনার পরপরই এলাকাবাসীর হাতে আটক হন। মহিন ও শাকিলকে ধরা হয় ট্রলারে করে পালিয়ে যাওয়ার সময়।

কল করে খোঁজ নেয় অজ্ঞাত ব্যক্তি
জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরের ওপর হামলার পরপরই একটি অজ্ঞাত নম্বর থেকে জাহাঙ্গীরের ফোন নম্বরে কল দিয়ে জানতে চাওয়া হয়, জাহাঙ্গীরের আত্মাটা তখনও আছে কিনা। শনিবার সমকালকে এসব কথা জানিয়েছেন তাঁর বড় ভাই, বিএনপি কর্মী শাহেরীল আলম তপন। তিনি বলেন, এ ঘটনায় মিঠামইন উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোকাররম হোসেন খোকাসহ আরও কয়েকজন জড়িত আছেন বলে নাম পাওয়া যাচ্ছে। তবে আরও নিশ্চিত হলে পুলিশকে জানাবেন।

তিনি বলেন, জাহাঙ্গীরের ওপর হামলার পরপরই একটি অচেনা নম্বর থেকে জাহাঙ্গীরের মোবাইলে ফোন দেওয়া হয়। সবাই জাহাঙ্গীরকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় কল ধরেন বাসার গৃহকর্মী। ফোন ধরতেই জিজ্ঞাসা করা হয়, ‘জাহাঙ্গীরের আত্মাটা এখনও যায় নাই?’ গৃহকর্মী ‘আপনি কে বলতেছেন?’ এই প্রশ্ন করতেই সংযোগ কেটে দেওয়া হয়। তারা নম্বরটি লিখে রেখেছেন। সেটি পুলিশকে দেওয়া হবে।

হামলার সময় এলাকাবাসী চাপাতিসহ জাহাঙ্গীরের সঙ্গী হাদিস মিয়ার সহায়তায় বরগুনা জেলার বামনা উপজেলার চালিতাবুনিয়া গ্রামের হেলালকে (২৫) হাতেনাতে ধরে ফেলেন। একই রাতে করিমগঞ্জের হাওর থেকে পুলিশ আটক করে লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার দুধরাজপুর গ্রামের মহিন ও একই উপজেলার মধ্যপাড়ার শাকিলকে।

শাহেরীল আলম তপনের দেওয়া তথ্যমতে, হত্যাকাণ্ডের তিন দিন আগে এই তিনজন মিঠামইনের ঘাগড়া গ্রামের সাগরের বাড়িতে উঠেছিলেন। ঘাগড়া বাজারের একটি মোবাইল ফোনের দোকানে তাদের একজন সাগরকে নিয়ে মোবাইলের সিম কিনতে যান। কিন্তু এনআইডি না থাকায় ব্যবসায়ী সিম বিক্রিতে রাজি হননি। তখন সাগর সিমটি কেনার ব্যবস্থা করেন।

জামিন করানো হয় আসামিকে
ঘাতক হেলাল কাশিমপুর কারাগারে একটি মামলায় বন্দি ছিলেন। জাহাঙ্গীরকে হত্যার জন্য মিঠামইন উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোকাররম হোসেন খোকা তাঁকে জামিনের ব্যবস্থা করেন। এ সময় খোকার সঙ্গে আরেকজন ছিলেন, তাঁকে চেনেন না হেলাল। এলাকাবাসীর কাছে ধরা পড়ার পর হেলালকে পিটুনি দেওয়া হয়। ওই সময়ের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, হেলালকে স্থানীয় লোকজন জিজ্ঞাসা করছেন, কার কথায় তিনি এই কাজ করেছেন। ভয় দেখানো হলে হেলাল বলেন, ‘পরে কই, মাথাটায় বাড়ি লাগছে। আমি পরে কই, ভাই।’ কিন্তু চাপের মুখে হেলাল বলতে থাকেন, ‘খোকা ভাই পাঠাইছে। খোকা ভাইয়ের সঙ্গে আরেকটা লোক আছে। তাঁকে আমি চিনি না। তাঁকে আমি প্রথম দেখছি। তিনি আমারে জামিন করাইছে কাশিমপুর থেকে। কইছে তুই কাজটা কইরা দিবি।’

স্থানীয় বিএনপির অনেকেই মনে করছেন, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও আধিপত্য নিয়ে বিরোধের জেরে জাহাঙ্গীর হত্যার শিকার হয়েছেন। ঘাগড়া ইউনিয়নের সাবেক এক জনপ্রতিনিধির দেওয়া তথ্যমতে, হামলার পর হেলাল তাৎক্ষণিকভাবে আটক হলেও মহিন ও শাকিল ঘটনার পর আবার ঘাগড়া গ্রামে সাগরের বাড়িতে যান। সেখানে রাতের খাবার সারেন। পরে সাগর একটি স্পিডবোট ভাড়া করে দুজনকে পালানোর জন্য করিমগঞ্জের বালিখলা ঘাটের দিকে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু গভীর রাতে করিমগঞ্জের হাওরেই তারা পুলিশের হাতে ধরা পড়েন।

ঘটনার পর থেকেই উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোকাররম হোসেন খোকার ফেসবুক ও মোবাইল ফোন বন্ধ। তিনি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরের মরদেহ দেখতেও যাননি, জানাজায়ও অংশ নেননি। এলাকাবাসীর ধারণা, তিনি আত্মগোপনে আছেন। এলাকা ছেড়েছেন ঘাগড়া গ্রামের সাগরও।

মিঠামইন থানার ওসি মনোয়ার হোসেন বলেন, গত শুক্রবার রাতেই লিখিত এজাহার পাওয়ার পর মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এতে তিনজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ উদ্ঘাটনসহ ঘটনায় জড়িত অন্য আসামিদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনার কাজ চলছে।

এ বিষয়ে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম বলেছেন, প্রকৃত দোষী যেই হোক, দলের পক্ষ থেকে তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। মিঠামইন উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোকাররম হোসেন খোকার নাম যেহেতু উঠেছে, তাঁকেও সংগঠন থেকে বহিষ্কারে কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন

×