ঢাকা শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

অভাবে বন্ধ জুলাই শহীদ সাব্বিরের সন্তানদের লেখাপড়া, নেই থাকার জায়গা

অভাবে বন্ধ জুলাই শহীদ সাব্বিরের সন্তানদের লেখাপড়া, নেই থাকার জায়গা
×

নেত্রকোনা প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ | ২২:০২

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে ঢাকার আশুলিয়ায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন কারখানা শ্রমিক সাব্বির ইসলাম (৪৪)। ঐতিহাসিক সেই গণঅভ্যুত্থান সফল হয়েছে, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হয়েছে, দেশে নির্বাচন হয়েছে, নতুন সরকার এসেছে ক্ষমতায়। কিন্তু একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে কারখানা শ্রমিক সাব্বির ইসলামের পরিবারে নেমে এসেছে অন্ধকার। চরম দারিদ্র্য, অনাহার আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করছে এই শহীদ পরিবার।

সাব্বিরের মৃত্যুর পর বাসা ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়েছেন তাঁর স্ত্রী ও সন্তানেরা। চার সন্তানকে নিয়ে এখন মানুষের দ্বারে দ্বারে আশ্রয় খুঁজছেন শহীদপত্নী ফরিদা আক্তার। অভাবের তাড়নায় বন্ধ হয়ে গেছে সন্তানদের লেখাপড়াও।

পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকাল ৯টার দিকে ঢাকার সাভারের আশুলিয়া এলাকার ভাড়া বাসা থেকে কাজের সন্ধানে বের হন সাব্বির ইসলাম। ওই সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সংঘর্ষ শুরু হলে তিনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যোগ দেন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সাভারে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। একটি গুলি তাঁর ডান কানের পাশ দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়।

শহীদ সাব্বির ইসলামের বাড়ি নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার লুনেশ্বর ইউনিয়নের খিলা বাউন্দি গ্রামে। তাঁর বাবা মৃত শুকুর আলী। প্রায় দুই দশক আগে সাব্বির উপজেলার বানিয়াজান গ্রামের জামাল উদ্দিনের মেয়ে ফরিদা আক্তারকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তিনি শ্বশুরবাড়িতেই বসবাস শুরু করেন এবং দিনমজুরসহ বিভিন্ন কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পরে সচ্ছলতার আশায় ঢাকার আশুলিয়ায় গিয়ে একটি সরিষার তেলের কারখানায় চাকরি নেন। স্ত্রী ও চার সন্তানকে নিয়ে সেখানেই একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন তিনি।

জুলাই অভ্যুত্থান শুরু হলে কারখানাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকার হয়ে পড়েন সাব্বির। ৫ আগস্ট সকালে কাজের সন্ধানে বের হয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনে অংশ নেন সাব্বির। সেদিন পুলিশের গুলিতে বিদ্ধ হয়ে শহীদ হন তিনি। পরের দিন ৬ আগস্ট লাশ গ্রামের বাড়ি আটপাড়ায় নিয়ে তার মরদেহ দাফন করা হয়। নিজেদের জমি না থাকায় অন্যের জমিতেই দাফন করা হয় সাবিবরকে। 

শহীদ সাব্বিরের তিন মেয়ে ও এক ছেলে। ১২ বছর বয়সী একমাত্র ছেলে মো. মমিন মিয়া বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী। বড় মেয়ে লিজা আক্তার অর্থাভাবে পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়তে পারেনি। বাবার মৃত্যুর পর পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে বাকি সন্তানদের লেখাপড়াও।

আটপাড়া উপজেলা সদরের একটি জরাজীর্ণ ঘরের বারান্দায় বসে কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফরিদা আক্তার বলেন, ‘ঘর থেকে বের হওয়ার সময় আমার স্বামী বলেছিল, বাজার-সদাই নিয়ে আসব। কাজ না পেলে ছাত্রদের সাথে আন্দোলন করে সরকার পতন ঘটিয়ে ঘরে ফিরব। সরকার পতন হয়েছে, কিন্তু আমার স্বামী আর ফিরে আসেনি। চার সন্তান নিয়ে আমি এখন কোথায় যাব? থাকার কোনো জায়গা নেই। ভাড়া দিতে না পারলে বাসা থেকে বের করে দেয়। বড় মেয়ের বিয়ের বয়স হচ্ছে, ছেলেটাও প্রতিবন্ধী। কীভাবে সংসার চালাব, বুঝতে পারছি না।’

সাব্বিরের শ্যালক মো. চঞ্চল মিয়া জানান, জায়গার সংকট ও পারিবারিক সমস্যার কারণে তাঁর বোন ভাড়া বাসায় উঠেছিলেন। কিন্তু কয়েক মাসের ভাড়া দিতে না পারায় বাড়িওয়ালা তাদের বের করে দিয়েছে। এখন তারা বিভিন্ন আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের বাড়িতে আশ্রয় খুঁজছেন।

শহীদ সাব্বিরের মেয়ে লিজা আক্তার বলেন, ‘বাবা চাইতেন আমি লেখাপড়া করে বড় মানুষ হই। এখন আমাদের লেখাপড়াও বন্ধ। আমাদের খবর কেউ নেয় না।’

বানিয়াজান গ্রামের বাসিন্দা মো. আগুর মিয়া বলেন, ‘শহীদ সাব্বিরের পরিবার চরম মানবিক সংকটের মধ্যে আছে। একজন শহীদের পরিবার এভাবে মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। পরিবারটিকে সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত দিয়ে একটি ঘর নির্মাণ করে দেওয়া উচিত।’

এ বিষয়ে আটপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহনুর রহমান বলেন, ‘পরিবারটি সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বিভিন্ন সহায়তা পাচ্ছে। তাদের নিজস্ব জমি না থাকায় নীতিমালা অনুযায়ী খাসজমিসহ একটি স্থায়ী ঘরের ব্যবস্থা করে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।’

আরও পড়ুন

×