অবৈধ বালুর ব্যবসা, ঝুঁকিতে বন্দর
মানিকগঞ্জের শিবালয়ের পাটুরিয়া ফেরিঘাটের কাছে বন্দর এলাকায় অবৈধভাবে চলছে বালুর ব্যবসা। সম্প্রতি তোলা সমকাল
নিরঞ্জন সূত্রধর, শিবালয় (মানিকগঞ্জ)
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
মানিকগঞ্জের শিবালয়ের পাটুরিয়ায় ফেরি ও লঞ্চ ঘাট এলাকায় দীর্ঘদিন অবৈধভাবে বালুর ব্যবসা চলছে। নিয়ম লঙ্ঘন করে এমন ব্যবসা নদী বন্দরটির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হলেও তা উচ্ছেদে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআইডব্লিউটিএর। তারা বালু ব্যবসায়ীদের সরে যেতে বার বার নোটিশ দিচ্ছে। এ ছাড়া উচ্ছেদ অভিযান চালাতে উপজেলা প্রশাসনকে মৌখিকভাবে অনুরোধ করেছে। যদিও উপজেলা প্রশাসন বলছে, এ জন্য তাদের কাছে লিখিত আবেদন করতে হবে।
বিআইডব্লিউটিএর আরিচা অফিস সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বলগেট দিয়ে বালু এনে ফেরি ও লঞ্চ ঘাট এলাকার নদীর তীরে স্তূপ করে রাখছেন। পরে এক্সক্যাভেটর দিয়ে কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতিদিন শত শত ট্রাক আসা যাওয়া করছে। বন্দর এলাকায় এ ব্যবসার কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকির পাশাপাশি দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তারা।
সরেজমিন দেখা গেছে, পাটুরিয়ায় এক ও দুই নম্বর ফেরি এবং লঞ্চ ঘাটের কয়েক গজের মধ্যে রেখে বালু স্তূপ করে রাখা। সেখান থেকে এক্সক্যাভেটর দিয়ে কেটে ট্রাকে তুলে বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, বছরের পর বছর এভাবে চললেও তা বন্ধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।
বিআইডব্লিউটিএর আরিচা অফিসের বন্দর কর্মকর্তা সুব্রত রায় বলেন, শিবালয় উপজেলার নিহালপুর থেকে শুরু করে হরিরামপুর পর্যন্ত প্রায় ৭-৮ কিলোমিটার নদীর তীরবর্তী এলাকা আমরা অধিগ্রহণ করেছি। বন্দর এলাকার মধ্যে অ্যাপ্রোচ সড়ক আটকে বালু ব্যবসায়ীরা অবৈধভাবে ব্যবসা করছেন। এতে ফেরি ও লঞ্চ ঘাট সরিয়ে আনা-নেওয়া করতে সমস্যায় পড়তে হয়। রাস্তা ব্লক করে রাখার কারণে ফেরিতে যানবাহন লোড-আনলোড করতেও সমস্যা হয়। এ ছাড়া ঘাট এলাকায় বায়ুদুষণ হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, পাটুরিয়া বন্দর এলাকার মধ্যে ১০-১২ স্থানে বালু স্তূপ করে রাখা হয়েছে। অবৈধ বালুর ব্যবসায়ীদের বার বার নোটিশ করা হয়েছে বালু সরিয়ে নেওয়ার জন্য। আমাদের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার না থাকার কারেণ অবৈধ বালুর ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ করতে পারছি না। আমি ২০ দিন আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এদের উচ্ছেদ করতে অনুরোধ করেছি।
এই কর্মকর্তা বলেন, অবৈধ বালু ব্যবসায়ী মন্তাজ উদ্দিন মাস্টারকে বালু সরিয়ে নিতে বললে কিছু দিন আগে আমাদের এক ফেরির স্টাফের ওপর চড়াও হয়েছিলেন। তাঁকে কিছু বলা যায় না। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মন্তাজ উদ্দিন মাস্টার বলেন, আমি বালুর ব্যবসা করি না। আমার জায়গা বালু ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দিয়েছি। বালু রাখার স্থানে তারা ফেরির পল্টুন রেখেছিল। ফেরির এক স্টাফের সঙ্গে সেটি সরিয়ে নেওয়া নিয়ে কথা হয়েছিল।
বিআইডব্লিউটিএর আরিচা অফিস সূত্রে জানা যায়, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে এক ও দুই নম্বর ফেরিঘাট এবং লঞ্চঘাট এলাকায় ভাঙনের কারণে ঘাটগুলো রক্ষায় সরকারকে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করতে হয়। এদিকে প্রতি বছর শুস্ক মৌসুমে নদীর তীর থেকে বালু কেটে বিক্রি করায় বর্ষা মৌসুমে স্থানীয়রা তাদের নদীর তীরবর্তী ফসলি জমি ও ঘরবাড়ি নদীর গর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন। বালু ব্যবসা ও ট্রাক আসা যাওয়ার কারণে নদীর পার ঝুঁকিতে পড়ছে।
বিআইডব্লিউটিএর আরিচা অফিসের এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, আলমগীর হোসেন, আব্দুল রাজ্জাক, সোহান ও সায়েদুর রহমানসহ ৮-১০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি বন্দর এলাকায় বালু ব্যবসা করছেন। জানতে চাইলে বালু ব্যবসায়ী সায়েদুর রহমান বলেন, তিনি তাঁর নিজস্ব জমিতে বালুর ব্যবসা করছেন।
আরেক ব্যবসায়ী আব্দুল রাজ্জাক বলেন, জমির মালিকের কাছ থেকে জমি বন্ধক নিয়ে তিনি বালুর ব্যবসা করছেন। বালু ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন বলেন, আমরা অনেককে ম্যানেজ করে এ বালুর ব্যবসা করছি।
আরিচা অফিসের বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল আলম বলেন, পাটুরিয়া বন্দর এলাকায় অবৈধ বালুর ব্যবসার কারেণ ফেরিতে যানবাহন ওঠানামা এবং রাস্তা আটকে ব্যবসা করায় যাত্রী ও যানবাহন চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।
শিবালয় থানার ওসি আমিনুল ইসলাম বলেন, বন্দর এলাকায় বালুর ব্যবসা বন্ধের জন্য চাইলে পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতা দেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনীষা রানী কর্মকার বলেন, বন্দর এলাকাটা বিআইডব্লিউটিএর। তারা বন্দর এলাকায় অবৈধ বালুর ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা বা সহযোগিতা চাইলে আমাদের লিখিতভাবে জানাতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত লিখিতভাবে কেউ কিছু জানাননি। জানালে অবৈধ বালুর ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- বালুদস্যু