এডিপি প্রকল্পে একের পর এক অসংগতি
কাজের দেখা নেই, বিল তোলা সারা
একই প্রকল্পে পাঁচ মাস পর ফের বরাদ্দ
এডিপির আওতায় সংস্কারকাজ দেখানো হয়েছে বগুড়ার আদমদীঘির এই আবাসিক ভবনের। গত সোমবার সরেজমিনে দেখা যায় ভবনটির জরাজীর্ণ দশা -সমকাল
লিমন বাসার, উত্তরাঞ্চল
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৯:০৩ | আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৯:০৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলা পরিষদ চত্বরে পুরোনো ভবনের দেয়ালে রং খসে পড়েছে, কোথাও পলেস্তারা উঠে গেছে, কোথাও জমেছে শ্যাওলা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সরকারি বাসভবনের প্রবেশপথ, কৃষি অফিসসংলগ্ন সড়ক, প্রশাসনিক ভবন, পুরোনো প্রশাসনিক ভবন এবং যমুনা-রূপসা আবাসিক ভবনেও সাম্প্রতিক সংস্কারের দৃশ্যমান কোনো আলামত নেই। অথচ এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে দাবি করে জুন ক্লোজিংয়ের আগেই ৮৬ লাখ ৭৯ হাজার ২০১ টাকা বিল উত্তোলন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় বাস্তবায়িত এসব প্রকল্প নিয়ে অনুসন্ধানে সরকারি নথি, মাঠের বাস্তবতা এবং প্রশাসনের ব্যাখ্যার মধ্যে একাধিক অসংগতি পাওয়া গেছে। দৃশ্যমান কাজের প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও বিল উত্তোলনের দাবি, সরকারি প্রজ্ঞাপনে না থাকা প্রকল্পে কার্যাদেশ এবং একই প্রকল্পে অল্প সময়ের ব্যবধানে পুনরায় বরাদ্দের তথ্য সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
উপজেলা প্রকৌশলী রিপন কুমার সাহা জানান, গত ১৫ জুন চারটি কার্যাদেশের মাধ্যমে মোট ৮৬ লাখ ৭৯ হাজার ২০১ টাকার কাজ দেওয়া হয়। সব কাজ ৩০ জুনের আগেই শেষ হয়েছে এবং ঠিকাদাররা বিল তুলে নিয়েছেন। কার্যাদেশ পাওয়া এমএস অর্পা কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী আনোয়ার হোসেন রোমানও একই দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, কার্যাদেশ পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যেই কাজ
শেষ করে জুন ক্লোজিংয়ের আগেই পুরো বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
তবে সরেজমিনে উপজেলা পরিষদ এলাকায় গিয়ে ওই দাবির সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যায়নি। কৃষি অফিস পর্যন্ত সড়ক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সরকারি বাসভবনের প্রবেশপথ, প্রশাসনিক ভবন, পুরোনো প্রশাসনিক ভবন এবং যমুনা ও রূপসা আবাসিক ভবনে সাম্প্রতিক সংস্কারের দৃশ্যমান কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। কোথাও নতুন আরসিসি ঢালাই, কার্পেটিং কিংবা রং করার চিহ্ন চোখে পড়েনি, অবহেলার চিত্রই স্পষ্ট।
উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোমানা আফরোজের দায়িত্বকালে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত প্রশাসনিক ভবনসহ কয়েকটি স্থাপনায় উন্নয়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ হয়েছিল। এরপর একই স্থাপনায় আবার সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, বর্তমানে উপজেলা পরিষদের দক্ষিণ ও পূর্ব পাশের সীমানাপ্রাচীর পুনর্নির্মাণের কাজ চলছে। কোথাও ইট-বালু ফেলে রাখা হয়েছে, কোথাও চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। কিন্তু স্থানীয় সরকার বিভাগের ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর এবং ২০২৬ সালের ১০ মে জারি করা দুটি সরকারি প্রজ্ঞাপন পর্যালোচনায় দেখা যায়, কোনোটিতেই সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ বা অফিসার্স ক্লাব সংস্কারের জন্য বরাদ্দের উল্লেখ নেই। অথচ উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয়ের কার্যাদেশ অনুযায়ী, গত ১৫ জুন সীমানাপ্রাচীর মেরামতে ২৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং অফিসার্স ক্লাব সংস্কারে ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ না থাকা দুটি প্রকল্পেই একদিনে ৩৮ লাখ টাকার কার্যাদেশ জারি করা হয়েছে।

সরকারি নথি বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর জারি হওয়া প্রজ্ঞাপনে উপজেলা উন্নয়ন সহায়তা খাত থেকে ছয়টি প্রকল্পে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। মাত্র পাঁচ মাস পর, ২০২৬ সালের ১০ মে একই ধরনের প্রকল্পে আবারও ৫০ লাখ টাকার বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়।
দুটি প্রজ্ঞাপনের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভাষাগত সামান্য পরিবর্তন ছাড়া প্রকল্পগুলোর ধরন প্রায় অভিন্ন। ফলে যেসব প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে বলে বিল উত্তোলনের দাবি করা হচ্ছে, সেই একই প্রকল্পে অল্প সময়ের ব্যবধানে পুনরায় বরাদ্দ অনুমোদনের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুমা বেগম বলেন, দ্বিতীয়বার তাঁরা নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু মন্ত্রণালয় ভুলবশত আগের প্রকল্পগুলোর নামেই বরাদ্দ দেয়। পরে সেটি সংশোধন করা হয়েছে। এখন সীমানাপ্রাচীর পুনর্নির্মাণ ও কৃষি অফিসের রাস্তার কাজ হবে। তবে তিনি ওই দাবির পক্ষে কোনো সংশোধিত সরকারি প্রজ্ঞাপন, প্রকল্প পরিবর্তনের অনুমোদন, নতুন প্রকল্প তালিকা কিংবা আগের বরাদ্দ বাতিলের সরকারি নথি দেখাতে পারেননি। বর্তমানে কোন প্রজ্ঞাপন কার্যকর, সে বিষয়েও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর এবং ২০২৬ সালের ১০ মে জারি হওয়া দুটি প্রজ্ঞাপনের স্মারক নম্বর, জারিকারী কর্মকর্তা ও প্রকাশের তারিখ আলাদা। দ্বিতীয়টি কোনো সংশোধনী নয়; এটি একটি স্বতন্ত্র সরকারি প্রজ্ঞাপন। ফলে প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী ভুল হয়ে থাকলে তার লিখিত সংশোধনী থাকার কথা। অনুসন্ধানে এমন কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
আরও একটি অসংগতি মিলেছে অর্থ ব্যয়ে। দ্বিতীয় দফার বরাদ্দ ছিল ৫০ লাখ টাকা। এখন পর্যন্ত পাওয়া কার্যাদেশের পরিমাণ ৩৮ লাখ টাকা। অবশিষ্ট ১২ লাখ টাকার বিপরীতে কোনো কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে কিনা, অথবা অর্থটি এখনও অব্যবহৃত রয়েছে কিনা–সে বিষয়ে উপজেলা প্রশাসন কোনো তথ্য দিতে পারেনি।
সাবেক যুগ্ম সচিব মোস্তাফিজার রহমান মৃধা বলেন, সরকারি প্রজ্ঞাপনে ভুল হলে তা সংশোধনের জন্য পৃথক সংশোধনী প্রজ্ঞাপন জারি করা বাধ্যতামূলক। একইভাবে অনুমোদিত প্রকল্প পরিবর্তন, নতুন প্রকল্প সংযোজন বা বরাদ্দ স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও লিখিত সরকারি নথি থাকতে হবে। লিখিত অনুমোদন ছাড়া মৌখিক ব্যাখ্যা প্রশাসনিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুপ্র)-এর সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, একই প্রকল্পে পুনরায় বরাদ্দ, সরকারি প্রজ্ঞাপনের বাইরে কার্যাদেশ এবং মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে সরকারি নথির অসামঞ্জস্য–সব মিলিয়ে বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক তদন্ত দাবি করে। তাঁর মতে, শুধু বরাদ্দপত্র নয়; কার্যাদেশ, মাপ বই (এমবি), বিল-ভাউচার, কাজের অগ্রগতি এবং চূড়ান্ত বিল পরিশোধের নথিও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
- বিষয় :
- এডিপি