ঢাকা শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

ভরা মৌসুমের প্রথম মাস

ইলিশ আহরণ কাগজে তিন গুণ, বাস্তবে মিলছে না

খুলনা ও বরিশালে ইলিশ আহরণ ও সরবরাহ পরিস্থিতি

ইলিশ আহরণ কাগজে তিন গুণ, বাস্তবে মিলছে না
×

ফাইল ফটো

 সুমন চৌধুরী, বরিশাল 

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৩১ | আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২৬ | ১১:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভরা মৌসুমের দেড় মাস শেষ হলেও বাজারে ইলিশ নেই বললেই চলে। উচ্চ দামের কারণে এ রুপালি মাছটি মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। কিন্তু মৎস্য অধিদপ্তরের কাগজের হিসাব দিচ্ছে ভিন্ন তথ্য। মৌসুমের প্রথম মাসে জুনে দক্ষিণাঞ্চলের নদনদী ও সাগরে গত বছরের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি ইলিশ আহরিত হয়েছে। গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বাধিক ইলিশ আহরিত হয়েছে গত মাসে। কিন্তু মোকাম ও হাটবাজারে আসা ইলিশের পরিমাণ মৎস্য অধিদপ্তরের কাগজের হিসাবকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। 

মৎস্যসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আহরিত হওয়া ইলিশের দুই-তৃতীয়াংশ জাটকা (১০ ইঞ্চির কম আকারের) ও ছোট আকারে ইলিশ। জাটকা নিধন ও বিক্রি দণ্ডযোগ্য অপরাধ। জাটকা নিধনও হচ্ছে নিষিদ্ধ ট্রলিং জাহাজ দিয়ে। আহরণ ও বিক্রয় নিষিদ্ধ ইলিশে মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে আহরণ বেড়েছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে জাটকাও মিলবে না। 

জানা গেছে, বর্ষা মৌসুমকে ইলিশ মৌসুম হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রজনন ও জাটকা বড় হওয়া নিরাপদ করতে নদী-সাগরে পর্যায়ক্রমে বছরের আট মাস বিভিন্ন মেয়াদে আহরণে নিষেধাজ্ঞা পালিত হয়। সর্বশেষ সাগরে ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হয়েছে গত ১১ জুন। আগামী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত নদী-সাগরে কোনো নিষেধাজ্ঞা থাকবে না। তাই এই চার মাস ইলিশের ভরা মৌসুম হিসেবে গণ্য হয়। দেশে মোট আহরিত ইলিশের ৭০ ভাগ পাওয়া যায় দক্ষিণাঞ্চলের নদী-সাগরে। 

মৎস্য অধিদপ্তরে বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত জুনে বিভাগের ছয় জেলায় মোট ৪০ হাজার ৫১৬ টন ইলিশ আহরিত হয়েছে। 

গত বছর এ সময় আহরিত হয় ১৪ হাজার ৪৯৬ টন। অর্থাৎ গত বছরের চেয়ে এবার ২৬ হাজার ৩২০ টন বেশি আহরিত হয়েছে। 

এর আগে ২০২৪ সালে ২১ হাজার ৮২৭ টন, ২০২৩ সালে ১৫ হাজার ৪৮২ টন, ২০২২ সালে ৩০ হাজার ৮২০ টন ও ২০২১ সালে ১৫ হাজার ৮৯২ টন। 
মৎস্য অধিদপ্তরের কাগজপত্রের হিসাবে, অতীতের রেকর্ড ভেঙে এবারের জুনে প্রায় তিন গুণ বেশি আহরণ করা হয়। অথচ বাজারে সরবরাহ সীমিত। এ বিষয়ে জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আহরণ অল্প পরিমাণ বেড়েছে, তবে সেটাও ইলিশের ‘সর্বনাশ’ করে। নিষিদ্ধ ট্রলিং জাহাজ দিয়ে মোহনায় থেকে জাটকা ইলিশ ছেঁকে তোলা হচ্ছে।
পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা-সংলগ্ন সাগরের কিনারে ১৭ বছর ধরে মাছ ধরছেন জেলে ফোরকান সরদার। তিনি বলেন, ‘আগে যেডা ছোড ইলিশ আছেলে হেইডারও ওজন আছেলে আধ কেজি। এহন যে পাই তাতে ছয়ডায় এক কেজি হয়।’ 

এ জেলের দেওয়া তথ্য মতে, পর্যাপ্ত বড় ইলিশ থাকায় তিনি আগে চার থেকে সাড়ে চার ইঞ্চি ফাঁসের জাল পাততেন। ইলিশ ছোট হয়ে যাওয়ায় এখন তিন থেকে সাড়ে তিন ইঞ্চি ফাঁসের জাল ব্যবহার করেন। এতে প্রচুর জাটকা পাচ্ছেন। 
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার জেলে মতি মাঝির জানান, কাঠের তৈরি ট্রলিং জাহাজে ইলিশের রেণুও নিধন করা হয়। এজন্য বড় ইলিশ কমে গেছে। 
পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের বিপণন ব্যবস্থাপক (চলতি দায়িত্ব) দেলোয়ার হোসাইন জানান, গত বছরের চেয়ে এবার পাথরঘাটায় ইলিশের আমদানি একটু বেশি। এর কারণ নিষিদ্ধ ট্রলিং ট্রলারগুলো বিভিন্ন কৌশলে মাছ এনে তাদের মার্কেটে বেচাকেনা করছে। আগে চোরাইভাবে বিক্রি করায় সেটা হিসাবে যুক্ত হতো না। 

ইলিশে বিস্ময়কর তথ্য
সাগরতীরের পাথরঘাটা উপজেলায় দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ মৎস্য মোকাম। মোহনা ও সাগরের আহরিত ইলিশ এ মোকামে বিক্রি হয়। গত বছর জুনে ৫৯ দশমিক ৫১ টন ইলিশ বিক্রি হয়। এ বছর জুনে বিক্রি হয় ১১৪ দশমিক ৬৮ টন। 

মৎস্য অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যে গত দুই বছর বরিশাল বিভাগে মোট আহরণের অর্ধেকের বেশি ভোলা জেলায় দেখানো হচ্ছে। এ বছরের জুনে ৪০ হাজার ৫১৬ টনের মধ্যে ২৯ হাজার ৪৪৪ টন পাওয়া গেছে ভোলায়। গত বছর জুনেও আহরিত ১৪ হাজার ৪৯৬ টনের মধ্যে ভোলার ছিল সাত হাজার ৬৫০ টন। 
এ তথ্যের বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন ভোলার চরফ্যাসন উপজেলার সামরাজ মাছ ঘাটের আড়তদার আলাউদ্দিন পাটোয়ারী। মেঘনার মোহনায় এ মাছ ঘাট অবস্থিত। এ মাছ ঘাটে ৪৭ বছর ধরে ইলিশের ব্যবসা করছেন আলাউদ্দিন। তিনি বলেন, মেঘনার ইলিশ নেই। ট্রলার সাগরে বাজার খরচও ওঠাতে পারে না। মৎস্য অধিদপ্তর আমলাতান্ত্রিক হিসাব দেখাচ্ছে। 
জাটকা নিধনে ইলিশ কমেছে সেটা স্বীকার করেন অধিদপ্তরের বরিশালের উপপরিচালক মো. মহসীন। এ ক্ষেত্রে তাঁর দপ্তরের জনবল সংকটসহ নানা সীমাবদ্ধতার কথা জানান। তবে এ বছরে জুনে গত বছরের তিন গুণ ইলিশ আহরণ এবং বাজারে সংকটের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়ে বলেছেন, মাঠ পর্যায় থেকে তারা তথ্য সংগ্রহ করেছেন। 

বার্ষিক আহরণ কমেছে 
গত পাঁচ বছরে বরিশাল বিভাগে ইলিশের আহরণ কমেছে এক লাখ দুই হাজার ৭০৪ টন। বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, ২০২০-২১ সালে আহরিত হয়েছিল তিন লাখ ৬৯ হাজার ৩০১ টন। পাঁচ বছরে কমে সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ বছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় দুই লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ দশমিক ১৫০ টন। তার আগের বছর ২০২৪-২৫ সালে তিন লাখ ৪৭ হাজার ৭৮৩ টন আহরণ হয়। সে হিসাবে ৬৮ হাজার টন আহরণ কমেছে গত এক বছরে। পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বাধিক আহরণ হয়েছিল ২০২২-২৩ সালে তিন লাখ ৩৪৩ টন। 

সাধ্যের বাইরে দাম
কাগজপত্রের হিসাবে এবার যে পরিমাণ আহরণ তাতে গত বছরের চেয়ে দাম কম হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তব চিত্র উল্টো। বরিশাল পোর্ট রোড মোকামের আড়তদার নাসির উদ্দিন মিয়া জানান, আকার ভেদে গত বছরের চেয়ে এ বছর প্রতি কেজিতে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা দাম বেশি। মোকামে সবচেয়ে বেশি আমদানি হচ্ছে জাটকা। যেটির ওজন ৩০০ গ্রামের কম। গত ১৮ জুলাই মোকামে এই আকারের ইলিশ পাইকারি ৮০০ ও খুচরা ৯০০ টাকার বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। গত বছর একই ইলিশ ৫০০ টাকার কম ছিল বলে জানান তিনি। 
নগরের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাইমুন ইসলাম জানান, গত ১৬ জুলাই পোর্ট রোড থেকে জাটকার চেয়ে সামান্য বড় পাঁচ পিস ইলিশ কিনেছেন। যার মোট ওজন হয়েছে এক কেজি ৭০ গ্রাম। দাম নেওয়া হয়েছে কেজি এক হাজার ১০০ টাকা। 

অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক আব্দুর রহমান জানান, দুটি ইলিশে এক কেজি ৬০০ গ্রাম কিনেছেন তিন হাজার টাকায়। পোর্ট রোড মোকাম সূত্রে জানা গেছে, ১৮ জুলাই ১২০০ গ্রাম আকারের ইলিশের পাইকারি দাম ছিল কেজি দুই হাজার ৭৫০ টাকা, এক কেজির দুই হাজার ৬৫০ টাকা, ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রামের দুই হাজার ৩৫০ টাকা, ৫০০ গ্রাম আকার এক হাজার ৯৫০ টাকা, ৪০০ গ্রাম আকার দেড় হাজার টাকা এবং ৩০০ গ্রাম আকার এক হাজার ১৫০ টাকা। খুচরা বিক্রেতারা আরও দুই থেকে ৩০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করেছেন। 

 

আরও পড়ুন

×