বনে দূষণ, বিপদে বাঘ
বিশ্ব বাঘ দিবস
হাসান হিমালয়, খুলনা
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫২ | আপডেট: ২৯ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
সুন্দরবনের বাঘের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না এমন ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ১৫ ধরনের পরজীবী শনাক্ত করা হয়েছে। এগুলো দীর্ঘ মেয়াদে বাঘের জীবন ঝুঁকির কারণ হতে পারে। এক গবেষণা এ তথ্য উঠে এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে, নদী-খালের দূষিত পানির মাধ্যমে এগুলো হরিণ, বানরসহ অন্য প্রাণীর শরীর থেকে বাঘে ঢুকেছে।
‘সুন্দরবনের বাঘের পরজীবী সংক্রমণ ও অন্যান্য সংক্রামক রোগ, রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু ও সংক্রমণের ব্যাপ্তি’ শীর্ষক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। দুই বছর ধরে গবেষণা শেষে গত মার্চে এর ফলাফল প্রকাশ করা হয়। দেশে বাঘসহ সুন্দরবনের প্রাণীদের ওপর এ ধরনের গবেষণা এটিই প্রথম।
গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবন থেকে সংগ্রহ করা বাঘের মলের ৮৫ দশমিক ৩ শতাংশ নমুনাতেই কোনো না কোনো পরজীবীর উপস্থিতি রয়েছে। শুধু বাঘ নয়, বাঘের শিকার হরিণের মধ্যে ৭৩ দশমিক ৬ শতাংশ, বানরের মধ্যে ৮৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং শূকরের শরীরে ৬৬ দশমিক ৭ শতাংশ নমুনায় পরজীবী পাওয়া গেছে।
আশার কথা হচ্ছে, বাঘের নমুনায় কোনো মরণঘাতী ক্যানাইন ডিসটেম্পার ভাইরাস (সিডিভি) পাওয়া যায়নি। তবে বনের পাশের গ্রামগুলোর ৫৬ শতাংশ কুকুরের মধ্যে এই ভাইরাসের অ্যান্টিবডি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, কুকুরগুলো কোনো না কোনো সময় এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিল। যদি কোনোভাবে কুকুরগুলো বনের গভীরে যায় বা বাঘের সংস্পর্শে আসে, তাহলে বাঘের শরীরে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কেন এই গবেষণা
দক্ষিণাঞ্চলের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ সুন্দরবন টিকিয়ে রাখতে বাঘ রক্ষার বিকল্প নেই। এ জন্য সরকার বাংলাদেশ টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন করে। সেই পরিকল্পনার আলোকে গ্রহণ করা হয় ‘সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প’। প্রকল্পের আওতায় ২০২৪ সালের সর্বশেষ জরিপে সুন্দরবনে ১২৫টি বাঘ পাওয়া যায়। একই বছর বাঘের শরীরে পরজীবী সংক্রমণ ও অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধি শনাক্তে শুরু হয় গবেষণা।
বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের পরিচালক ও সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, বাঘ নিয়ে গবেষণা হয়েছে। কিন্তু বাঘের রোগতত্ত্ব নিয়ে আগে কখনও কাজ হয়নি। বাঘের দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গবেষণাটি জরুরি ছিল। গত মার্চে এর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ হয়েছে। সে অনুযায়ী কাজও শুরু হয়েছে। বনের ৭৪ কিলোমিটার এলাকায় নাইলন সুতার বেড়া দেওয়ার কারণে কুকুরসহ বাইরের প্রাণী প্রবেশ বন্ধ হয়েছে।
যেভাবে গবেষণা
সুন্দরবনের চাঁদপাই, শরণখোলা, খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জের ৬৫টি গ্রিড থেকে ক্লাস্টার গ্রিড অ্যাপ্রোচ পদ্ধতি ব্যবহার করে বেঙ্গল টাইগার ও এর শিকার প্রজাতির মোট ৩৯৯টি নমুনা সংগ্রহ হয়। এর মধ্যে বাঘের মলের নমুনা ছিল ২৩২টি। রোগ কীভাবে ছড়াচ্ছে বুঝতে বাঘের খাবার হরিণ, বন্য শূকর, বানরের মল এবং বনের আশপাশের আটটি গ্রামের কুকুরের রক্ত ও মলদ্বার থেকে আঠালো নমুনাও পরীক্ষা করা হয়।
এরপর এসব নমুনা ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএইউ) পরজীবীবিদ্যা গবেষণাগার ও অণুজীববিদ্যা গবেষণাগারে এবং সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (এসএইউ) ভাইরাস বিদ্যা গবেষণাগারে পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণায় পরামর্শক দলের প্রধান ছিলেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সুলতান আহমেদ। সদস্য ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলিম, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আলী জিন্নাহ, খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সালাউদ্দিন, আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞানী ড. সুকান্ত চৌধুরী, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডেটা অ্যানালিস্ট মো. শহীদুল ইসলাম।
বাঘের শরীরে ১৫ ধরনের পরজীবী
গবেষণায় বাঘের মলে ১৫ প্রজাতির পরজীবী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে একটি নমুনায় সর্বোচ্চ চারটি ভিন্ন প্রজাতির পরজীবী পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে সেস্টোড প্রজাতির স্পিরোমেট্রা ম্যানসোনি নামের এক ধরনের ফিতাকৃমি, যার সংক্রমণের হার ৬০ দশমিক ৩ শতাংশ। নেমাটোড প্রজাতির টঙোকারা ক্যাটি নামের গোলকৃমি পাওয়া গেছে ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রোটোজোয়া প্রজাতির ব্যালানটিডিয়াম কোলাই পাওয়া গেছে ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ। সেস্টোড প্রজাতির ইকাইনোককাস গ্রানুলোসাস ফিতা কৃমি ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ এবং অ্যানসিলোস্টোমা স্পিসিজ নামের এক ধরনের হুকওয়ার্ম পাওয়া গেছে দশমিক ৯ শতাংশ।
৪ ধরনের ব্যাকটেরিয়া
সুন্দরবনের প্রাণীদের মধ্যে ক্লেবসিয়েলা নিউমোনি, এন্টারোকক্কাস ফেকালিস, এসেরিচিয়া কোলাই এবং স্ট্যাফাইলোকক্কাস অরিয়াস নামে ৪ ধরনের ব্যাকটেরিয়া শনাক্ত করা হয়েছে। পিসিআর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের হার কে নিউমোনি-এর ক্ষেত্রে ৮০ দশমিক ৭৭ শতাংশ, ই ফেকালিসের ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ, এস অরিয়াসের ক্ষেত্রে ৫৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ, ই কোলাইয়ের ক্ষেত্রে ৭৬ দশমিক ৯২ শতাংশ পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে ই কোলাই এবং কে নিউমোনিকে মলিকুলার (পিসিআর) পদ্ধতিতে শনাক্ত করার এটিই বাংলাদেশের প্রথম গবেষণা। এই গবেষণায় পাওয়া ব্যাকটেরিয়াগুলোর বড় বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী, যা বন্যপ্রাণী চিকিৎসায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
গবেষণা দলের পরামর্শক বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুল আলিম বলেন, টক্সোকারা ক্যাটি নামের গোলকৃমি বাঘ শাবকদের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এই প্রজাতির অন্য ধরনের কৃমি গরু ও মহিষের শরীরে দেখা যায়। গরু-মহিষের ছানা এসব কৃমিতে আক্রান্ত হলে অনেক সময় মারা যায়। স্পিরোমেট্রা ম্যানসোনি প্রাণীর মস্তিষ্ক, চোখ বা মেরুদণ্ডে প্রবেশ করে টিস্যুর ক্ষতি করতে পারে। ব্যালানটিডিয়াম কোলাই এর কারণে ডায়রিয়া ও আমাশয়, ইকাইনোককাস গ্রানুলোসাস শরীরে হাইড্রাটিড সিস্ট তৈরি এবং কিছু কৃমি অন্ত্রের দেয়ালে কামড়ে ধরে রক্ত চুষে নেয়।
গবেষকরা জানান, ব্যাকটেরিয়াগুলো সাধারণত প্রাণীর শরীর ও অন্ত্রে স্বাভাবিকভাবে থাকতে পারে, কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশে ক্ষতস্থানে সংক্রমণ, নিউমোনিয়া ও রক্তে বিষক্রিয়াসহ নানা জটিলতার সৃষ্টি করতে পারে।
যেভাবে প্রাণীর শরীরে এলো ব্যাকটেরিয়া
গবেষণা দলের পরামর্শক খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক সালাউদ্দীন বলেন, নদী-খালের পানি ভাটার সময় বনের মধ্যে যায়। এসব পানিতে হাসপাতালের বর্জ্য, মানুষের মলসহ নানা দূষণ ও অ্যান্টিবায়োটিকস এবং অ্যান্টি বায়োটিকসের রেসিডিউস থাকে। এ ছাড়া বনসংলগ্ন নদীতে যে ট্রলার-লঞ্চ চলাচল করে, বনে মাছ ধরতে যাওয়া মৎসজীবী, মৌয়াল, বনকর্মী, পর্যটকদের মল নদীতেই ফেলা হয়। ওই মলে থাকা অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্স জীবাণু বনের ভেতরে যায়, মাছ ও বন্যপ্রাণীতে সংক্রমিত হয়। অন্য প্রাণী শিকারের মাধ্যমে এসব জীবাণু বাঘের শরীরে ঢোকে।
করণীয় কী
গবেষণা দলের প্রধান সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড ইম্যুনোলজি বিভাগের অধ্যাপক সুলতান আহমেদ বলেন, বনের পশুদের তো ওষুধ খাওয়ানো যাবে না, তারা যাতে নতুন করে কিছুতে আক্রান্ত না হয়– সেটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য বনের বাইরের কোনো ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী যাতে বনের মধ্যে প্রবেশ না করে এবং বন্যপ্রাণীতে সংক্রমিত ব্যাকটেরিয়া যাতে লোকালয়ে ছড়িয়ে না পড়ে সেজন্য বনের চারপাশে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হবে।
জরুরি ভিত্তিতে বনের চারপাশের কুকুরগুলোকে ক্যানাইন ডিসটেম্পার (সিডিভি) এবং জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া, বনের ভেতরে পোষা প্রাণী বা গবাদি পশু নেওয়া কঠোরভাবে বন্ধ করা, সীমান্তবর্তী এলাকার গবাদি পশুকে নিয়মিত কৃমিনাশক ওষুধ খাওয়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে সুন্দরবনে প্রবেশকারী বনজীবীদের জন্য নিয়মিত কৃমিনাশক সেবন ও স্বাস্থ্য সনদ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
গবেষণার সুপারিশে বন্যপ্রাণীর রোগ নির্ণয়ের জন্য একটি ‘সেন্ট্রাল ওয়াইল্ডলাইফ ডিজিজ ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরি’ প্রতিষ্ঠা করা এবং বন বিভাগে বিশেষজ্ঞ ভেটেরিনারি সার্জন ও এপিডেমিওলজিস্ট নিয়োগ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, পরামর্শগুলো কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ওয়াইল্ডলাইফ ডিজিজ ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরি স্থাপনাসহ অন্যান্য বিষয় নিয়ে বনমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনাও হয়েছে।