ঢাকা মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

বিসিআইসি

১৪ কোটি টাকার সার বিক্রিতে নয়ছয়, কর্মকর্তার মামলা

১৪ কোটি টাকার সার বিক্রিতে নয়ছয়, কর্মকর্তার মামলা
×

 দেবাশীষ ভট্টাচার্য, শেরপুর

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৭ | আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

কালোবাজারে সার বিক্রির অভিযোগে বিসিআইসির ১৫ ডিলারসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা হয়েছে। শেরপুর সদর থানায় মামলাটি করেন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন। গত ২২ জুলাই মামলা করার পর থেকে নিজ অফিসের কর্মকর্তাসহ কতিপয় ডিলারের চাপে পড়েছেন বলে অভিযোগ তাঁর। এক পর্যায়ে গত মঙ্গলবার রাতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বিষয়টি প্রকাশ করেন তিনি।

আসামিরা হলেন– শেরপুর সদরের বিসিআইসির সার ডিলার রাশেদুল ইসলাম, সুফিয়া বেগম রিপন, রফিকুল ইসলাম, সুবর্ণা সাহা রায়, মীর দেলোয়ার হোসেন, মরিয়ম আক্তার মুন্নী, ফরহাদ আলী, ইলিয়াস আলী, তাপস নন্দী, কামরুন নাহার হাশেম, সিরাজুল ইসলাম, ছামিদুল ইসলাম ফারাজী, রোরহান উদ্দীন, রেজাউল করিম, মাযহারুল ইসলাম। এ ছাড়া চন্দেরনগরের সাঈদ ট্রেডার্সের পরিচালনাকারী মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, শেখহাটির লাকী এন্টারপ্রাইজের পরিচালনাকারী মনিরুজ্জামান মনির, শেরপুর নিউমার্কেটের গৌরব ট্রেডার্সের পরিচালনাকারী প্রশান্ত সাহা রায়, থানা মোড়ের মেসার্স মল্লিক স্টোরের পরিচালনাকারী রতন মিয়া, ফকিরগঞ্জ বাজার বলায়ের চরের আব্দুল মান্নান ট্রেডার্সের পরিচালনাকারী বাদশা মিয়াকেও আসামি করা হয়েছে।

এজাহারে বলা হয়– চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জনু মাস পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ সার পাচার ও কালোবাজারে বিক্রি করেছেন আসামিরা। এর মধ্যে রয়েছে ১১ কোটি ৯১ লাখ ৪০ হাজার টাকা মূল্যের চার হাজার ৪১২ টন ইউরিয়া, এক কোটি ৭২ লাখ ৪১ হাজার টাকার ৮২১ টন ডিএপি, ৩৬ লাখ ১৮ হাজার টাকার ১৩৪ টন টিএসপি, ৩৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা মূল্যের ১৭২ টন এমওপি। এতে বাজারে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে সার কিনতে হয় কৃষকের।

কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনে ভাষ্য– সার পাচারের খবর পেয়ে গত ২৪ জুন শহরের মীর ট্রেডার্সে গিয়ে খুঁচরা ডিলারদের কাছে সার বিক্রির একটি ভাউচারে দেখতে পান। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি খুঁচরা সার বিক্রেতা জেসমিন এন্টারপ্রাইজের কাছে ৮৩৩৩ নম্বর ভাউচারে ৩০০ ব্যাগ ইউরিয়া সার বিক্রি করেন ওই ডিলার। একই দিন ৮৩৩৭ নম্বর ভাউচারে দেখা যায়, একই ব্যবসায়ী তাঁর কাছ থেকে আরও ৫০০ ব্যাগ ইউরিয়া সার কিনেছেন। কিন্তু খুঁচরা বিক্রেতা ওই কর্মকর্তাকে জানান, তিনি ৫০০ ব্যাগ ইউরিয়া নেননি। এ সময় তিনি নড়েচড়ে বসেন। পরে তিনি আরেক সার ডিলার রাশেদুল ইসলামের ভাউচার চেক করতে গিয়ে দেখেন, ২৬ জানুয়ারি থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত তিনি কুসুমহাটী বাজারের খুঁচরা বিক্রেতা রঞ্জিত বাবুর কাছে সার বিক্রি দেখিয়েছেন দুই হাজার ৩২৫ বস্তা। অথচ রঞ্জিত বাবু সার কিনেছেন এক হাজার বস্তার কিছু বেশি। এ সময় তিনি ১৫ ডিলার ও তাদের প্রতিষ্ঠান পরিচালনাকারী লোকজনের কাছ থেকে রেজিস্ট্রি খাতা, ভাউচার নিয়ে এসে যাচাই-বাছাই করে দেখেন সার নিয়ে সবাই নয়ছয় করেছেন।

কৃষি কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ডিলারদের কারসাজি ধরতে গিয়ে গত প্রায় এক মাস আমার জন্য ছিল নরকের মতো। প্রতিকার পেতে এমন কোনো জায়গা নেই যে আমি যাইনি। আমার বিভাগ পর্যন্ত আমার মুখের ওপর ফাইল ছুড়ে মেরেছে।’ তাঁর অভিযোগ– উপজেলা, জেলা প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যম কর্মীসহ সবার কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো তাঁকে হেনস্তা করা হয়েছে। মাত্র ২০ দিনে আটবার কারণ দর্শানোর নোটিশ পেয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ডিলারদের কাছ থেকে ঘুষ দাবি, অসদাচরণের ভিত্তিহীন অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। বিনয়ের সঙ্গে প্রতিবাদ করলে সেটি হয়ে গেছে ঔদ্ধত্য। এই কঠিন সময়ে পুলিশ বিভাগ ছাড়া কেউ তাঁকে সহায়তা করেনি। অবশেষে তাঁর ওপর অর্পিত ক্ষমতা বলে রাষ্ট্রের স্বার্থ সংরক্ষণে গত ছয় মাসে প্রায় ১৪ কোটি টাকার সার কালোবাজারির অভিযোগে ১৫ ডিলার ও তাদের পাঁচ সহযোগীর বিরুদ্ধে থানায় এজাহার দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘সব বিভাগীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মামলা করা হলেও আমার ওপর দায় চাপানো হচ্ছে যে, আমি সরকারকে বিব্রত করতে এসব করেছি। কি অদ্ভুত অভিযোগ! অথচ কৃষকরা নির্ধারিত মূল্যে সার না পেলে সরকারের দুর্নাম হবে।’ এই কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘একটি মহলের কৃষক এবং কৃষি নিয়ে সরকারের উদ্যোগ প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টাকে প্রতিহত করতে গিয়ে আমি রীতিমতো জীবনের ঝুঁকিতে আছি। চাকরি তো পরের কথা, এ যাত্রায় টিকে থাকতে পারলেই আলহামদুলিল্লাহ।’

বিষয়টি নিয়ে কথা হলে ডিলার রঞ্জিতের ছেলে বিপ্লব দে বলেন, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত একবার ৪০০, আরেকবার ৩০০ বস্তা ইউরিয়া সার পেয়েছেন তারা। এর বাইরে ৫০-১০০ বস্তা করে সার পেয়েছেন মাঝে মধ্যে। এতে সর্বোচ্চ এক হাজার বস্তা সার কিনেছেন তারা।

বিএডিসির ডিলার জেসমিন এন্টারপ্রাইজের মালিক উজ্জ্বল মিয়ার নামে দেড় হাজার বস্তা সার বিক্রির রসিদ আছে। কিন্তু তিনি এক দিনে মাত্র ৩২০ বস্তা সার উত্তোলন করেছেন।

খুঁচরা সার বিক্রেতা শহরের আখের মাহমুদ বাজারের মীম এন্টারপ্রাইজের মালিক আকবর আলী জানান, ডিলাররা অনৈতিক কাজে লিপ্ত। সময় মতো সার পান না তারা। দাম বেশি দিয়ে কিনতে হয় কৃষকদের।

ডিলার রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি অসুস্থ, কথা বলার মতো শক্তি-সামর্থ্য নেই। অন্য ডিলারের সঙ্গে কথা বলেন। তবে আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এসেছে তা সঠিক নয়।’

হাছনা ট্রেডার্সের মালিকের ছেলে আরিফুল ইসলাম জানান, সাব-ডিলারদের সঙ্গে অনেক সময় মনোমালিন্য হয়। এ জন্য তারা সার নিয়েও অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘৫৫ জন সাব-ডিলার আছেন, তাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই। শুধু আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ। আমরা অন্য উপজেলায় সার বিক্রি করিনি। আমাদের হেনস্তা করা হচ্ছে। আমরা তাঁর কী ক্ষতি করেছি?’

সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মুসলিমা খানম নিলু জানান, ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বিষয়টি আদালত ফয়সালা করবেন। সদর থানার ওসি সোহেল রানা বলেন, মামলা তদন্তাধীন। কোথায় কোথায় সার বিক্রি করেছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কিছু রেজিস্টারপত্র জব্দ করা হয়েছে। পর্যালোচনা চলছে। যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তারা হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়েছেন বলে শুনেছেন তিনি।

শেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাখাওয়াত হোসেনের ভাষ্য, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন তাদের কাছে আংশিক প্রতিবেদন দাখিল করেন। পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নির্দেশনা চেয়ে লিখিতভাবে জানানো হয়। সেই নির্দেশনা পাওয়ার আগেই এবং মাঠ পর্যায়ে যাচাইয়ের আগেই তিনি মামলা করেন। এ বিষয়ে তারা কিছু জানেন না।

তিনি বলেন, ‘কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা বলেন মামলা করতে গেলে অনুমতির প্রয়োজন হয়। তাই আমরা বলব আমাদের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই তিনি মামলা করেছেন। কিছু অনিয়ম আছে। যেহেতু তদন্তাধীন বিষয় আপাতত কিছু বলতে পারছি না।’

আরও পড়ুন

×