চট্টগ্রাম নগরীকে সাজাতে চতুর্থবার মহাপরিকল্পনা
ছবি: সংগৃহীত
তৌফিকুল ইসলাম বাবর, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩০ | আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
বন্দরনগরীকে নতুন রূপে গড়ে তুলতে ‘চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টারপ্ল্যান (২০২৫-৫০)’ শিরোনামে নতুন পরিকল্পনা করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। বন্দরনগরীকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো প্রণয়ন করা হলো মহাপরিকল্পনা। গতকাল শনিবার চউকে এক সংবাদ সম্মেলনে এর খসড়া প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে।
এতে মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্পের অগ্রগতি, জনমত গ্রহণ প্রক্রিয়া এবং বাস্তবায়ন কৌশলসহ নানা দিক তুলে ধরেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন। তিনি বলেছেন, এখন থেকে নকশার বাইরে কোনো স্থাপনা নির্মাণ এবং আবাসিক এলাকায় হাসপাতাল ও শিক্ষা কিংবা বাণিজ্যিক কোনো প্রতিষ্ঠান করতে দেওয়া হবে না। এর আগের প্ল্যানগুলোতে একই কথা বলা হলেও তা মানা হয়নি। যত্রতত্র গড়ে উঠেছে এমন প্রতিষ্ঠান।
২৫ বছর মেয়াদি এই মহাপরিকল্পনায় চট্টগ্রাম নগরীকে আরও বড় পরিসর দিতে, বিস্তৃত আকার দেওয়া হয়েছে। খসড়া চূড়ান্ত মহাপরিকল্পনায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডসহ পার্শ্ববর্তী পৌরসভা ও উপজেলার প্রায় এক হাজার ২৫৫ বর্গকিলোমিটার এলাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নগরীর পার্শ্ববর্তী আনোয়ারা, রাউজান, হাটহাজারী, পটিয়া, সীতাকুণ্ডসহ আরও কিছু এলাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে তিন হাজার ৫৮৭ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। সরকারি অর্থায়নে এটা বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ ছাড়া কর্ণফুলী টানেলকে কাজে লাগাতে ওয়ান সিটি, টু টাউন– ধারণাকে কাজে লাগানোর কথা বলা হয়েছে এই মহাপরিকল্পনায়।
চউক থেকে বলা হয়েছে, আজ রোববার থেকে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬০ দিন নাগরিকদের মতামত ও আপত্তি গ্রহণ করা হবে। ডিসেম্বরে এই পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে। নাগরিকরা চউক ভবনে সরাসরি উপস্থিত হয়ে অথবা ডিজিটাল ওয়েব-জিআইএস প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মতামত ও আপত্তি জানাতে পারবেন।
১৯৯৫ সালে প্রণীত মহাপরিকল্পনার সঙ্গে কনসালট্যান্ট হিসেবে যুক্ত থাকা পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া সমকালকে বলেন, অনেক টাকা খরচ করে নিয়মিতভাবে মাস্টারপ্ল্যান করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সেই মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী নগরীকে গড়ে তোলা হয় না। ১৯৯৫ সালে প্রণীত মাস্টারপ্ল্যানের ভিত্তিতে ২০০৮ সালে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান বা ড্যাপ করা হয়। কিন্তু সেই প্ল্যান মূল্যায়ন না করেই নতুন প্ল্যান প্রণয়ন করা হয়েছে। তাই শুধু প্ল্যান করলেই চলবে না, বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা সেটাই হচ্ছে আসল কথা।
তবে এবারের মাস্টারপ্ল্যানকে অবশ্য ব্যতিক্রম বলে মনে করেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন ড. মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান। তিনি জানিয়েছেন, এবারের মাস্টারপ্ল্যানটি তৃতীয় একটি ফার্মের বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে ভেটিং করা হচ্ছে। চুয়েট এটি ভেটিং করছে। একই সঙ্গে নাগরিকদের মতামতও গ্রহণ করা হচ্ছে। এতে মাস্টারপ্ল্যানের ভুলত্রুটি কিংবা যোগ-বিয়োগের কিছু থাকলে তা সংশোধন করার সুযোগ থাকছে।
চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন হয়েছিল ১৯৬১ সালে। সেই মাস্টারপ্ল্যানের আলোকে ১৯৬৫ সালে একটি রিভিও প্ল্যান হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৫ সালে আরেকটি মাস্টারপ্ল্যান হয়েছিল ২০ বছর মেয়াদি। সেই প্ল্যানের আলোকে ২০০৮ সালে ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রণয়ন হয়। আর সেই ড্যাপের আলোকেই মূলত বর্তমান চট্টগ্রাম নগরীর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়ে আসছিল।
কয়েক দশকের অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে চট্টগ্রাম তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পাহাড়, খাল ও জলাধারের বড় অংশ হারিয়েছে বলে বলে স্বীকার করেন চউক চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন। এজন্য এবার সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে পরিবেশ সংরক্ষণ, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্প পরিচালক আবু ঈসা আনসারী বলেন, একটি মাস্টারপ্ল্যান শুধু বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী কিংবা পরিকল্পনাবিদদের তৈরি নথি হতে পারে না। এটি একটি এলাকার বাস্তব সমস্যা ও প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি জানেন সেখানকার বাসিন্দারা। তাই নাগরিকের মতামতকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
চউক সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে মেয়াদ শেষ হয় ১৯৯৫ সালে প্রণীত ২০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানের। এরপর ২৫ বছরের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের জন্য ডিপিপি তৈরির কাজ শুরু।
- বিষয় :
- পরিকল্পনা
- চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ