কোটচাঁদপুরে আধুনিক ‘পলি হাউস’ চাষের সূচনা
ছবি: সমকাল
কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ১১:৩৯
কোটচাঁদপুরে আধুনিক পলি হাউস (পলি শেড) পদ্ধতিতে উন্নত মানের টমেটো, শসা ও লেটুস পাতার চাষ শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে আধুনিক কৃষিতে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন স্থানীয় চাষিরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) উদ্যোগে পাইলট প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়িত এই পদ্ধতির ফলে চাষিরা যেমন আর্থিকভাবে লাভবান হবেন, তেমনি ক্রেতারা পাবেন নিরাপদ ও বিষমুক্ত ফলমূল এবং সবজি।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, ‘পানি সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি এবং পলি শেড নির্মাণের মাধ্যমে নিরাপদ সবজি ও ফল-ফুল উৎপাদন’ প্রকল্পের আওতায় গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসেবে কোটচাঁদপুরে প্রথম পলি হাউস নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রথম পলি হাউসটি নির্মিত হয়েছে উপজেলার দুতিয়ার কুঠির মাঠে। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কোটচাঁদপুরে আরও ৩টি পলি হাউস নির্মাণ করেছে বিএডিসি। এর মধ্যে রয়েছে কোটচাঁদপুর পৌরসভাধীন জাবড়ে খাদ মাঠের আবুল হোসেনের শেড, বলুহর ইউনিয়নের কাগমারী গ্রামের মোসা মাস্টারের শেড এবং কোটচাঁদপুরের সাবদারপুর সড়কের কুশোকুড়ির মাঠে শাহজামাল খানের শেড। ইতোমধ্যে উৎপাদনে এসেছে দুতিয়ার কুঠির মাঠের আমির হোসেনের শেডটি।
সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছ থেকে শেডটি বুঝে পেয়ে চাষি আমির হোসেন প্রথম চাষ করেন বারি-৮ জাতের টমেটো আর অ্যারাবিয়ান শসা। পলি হাউসে টমেটো আর শসার উৎপাদন ভালো ছিল। তবে দেশে অ্যারাবিয়ান শসার প্রচলন না থাকায় বিক্রি করতে তাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। তবে টমেটো বাজারমূল্যের চেয়েও অধিক দামে বিক্রি করেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
আমির হোসেন বলেন, ‘২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই পলি শেডটি নির্মাণ করে দেয় বিএডিসি কর্তৃপক্ষ। শেডটি বুঝে পেয়ে প্রথমবার ২০ শতক জমির মধ্যে ১৫ কাঠা জমিতে টমেটোর চাষ এবং বাকি ৫ কাঠা জমিতে বারি-৮ জাতের অ্যারাবিয়ান শসার চাষ করেছিলাম। টমেটোতে ফলন ভালো হয়েছিল। তবে শসা বিক্রি করতে একটু বেগ পেতে হয়েছিল। মাত্র ৪-৫ মণ শসা বিক্রি করতে পেরেছিলাম। বাকি শসা জমিতে চাষ দেখতে আসা মানুষের মাঝে বিতরণ করে দিয়েছিলাম। ওই বছর শসায় লোকসান হয়েছিল; কারণ আমাদের দেশে অ্যারাবিয়ান শসার প্রচলন নেই। এ কারণে ওই শসার বিক্রিও কম।’
পলি শেড ছাড়াও তাঁর ২৫ বিঘা জমিতে মাল্টা, কমলা, পেয়ারা, পেঁপে, ঘাস ও ধানের চাষ রয়েছে বলে জানান তিনি।
পলি শেডের বিষয়ে আমিরুল ইসলাম নামের এক চাষি বলেন, ‘পলি শেড একটি আধুনিক চাষপদ্ধতি। এ চাষে আমরা অভ্যস্ত নই। এ কারণে বুঝতে একটু সময় লাগবে। তবে সংশ্লিষ্ট বিভাগ যদি যথাযোগ্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে, তাহলে পলি শেডে চাষ করে কৃষক লাভবান হবেন। আর ক্রেতারা পাবেন বিষমুক্ত অসময়ের সব উচ্চমূল্যের সবজি।’
লক্ষ্মীকুণ্ডু গ্রামের কৃষক শাহজামাল খান বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন চাষকাজের সঙ্গে যুক্ত আছি। প্রতিবছর ফুল, ফল দিয়ে ৩০-৪০ বিঘা জমিতে বিভিন্ন চাষ করে থাকি। এ কারণে পলি শেডে চাষ দেখে আমার আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর বিষয়টি নিয়ে কোটচাঁদপুর বিএডিসি অফিসে যোগাযোগ করলে তারা আমাকে আবেদন করতে বলে। সে অনুযায়ী আবেদন করার পর অফিস থেকে জমি পরিদর্শন করে আমাকে পলি শেড দেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পলি শেড পেয়েছি। এতে আমার কোনো খরচ করতে হয়নি। আমাকে শুধু ২৫ শতক জমি দিতে হয়েছে, আর বাকি সবকিছু বিএডিসি অফিস করে দিয়েছে। আমি এখনো চাষ শুরু করতে পারিনি। তবে চাষ করলে অবশ্যই ভালো কিছু হবে বলে আশা করছি।’
এদিকে নতুন এই চাষপদ্ধতি দেখতে পলি হাউসে ভিড় করছেন এলাকার উৎসুক চাষিরা। পাঁচলিয়া গ্রামের আলিম হোসেন তাদেরই একজন। তিনি বলেন, ‘প্রতিনিয়ত কোটচাঁদপুর থেকে সাবদারপুর সড়কে যাতায়াত করি। হঠাৎ করে মাঠের মধ্যে পলিথিনের ঘর দেখে মনের ভেতর প্রশ্ন জাগে, পলিথিন দিয়ে ঘিরে কী হচ্ছে! এরপর জানতে পারলাম নতুন এই চাষপদ্ধতির কথা। যে পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে, এতে সহজেই ভালো কিছু করা সম্ভব। মানুষও পাবেন নিরাপদ ও বিষমুক্ত ফুল, ফল ও সবজি।’
এ ব্যাপারে কোটচাঁদপুর বিএডিসি অফিসের উপসহকারী প্রকৌশলী (ক্ষুদ্র সেচ) এস এম আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘পলি শেডে মূলত উচ্চ ফলনশীল ফুল, ফল ও সবজির চাষ হয়ে থাকে। এখান থেকে বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্য পাওয়া যায়। এ ছাড়া শেড থেকে আমরা অসময়ের সবজিও পেতে পারি। এ কারণে উৎপাদিত পণ্যের বাজারমূল্যও বেশি পেয়ে থাকেন চাষিরা।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি মূলত পাইলট প্রকল্প হিসেবে করা হয়েছে। এটি দেখে মানুষ যেন নিজ উদ্যোগে পলি শেড তৈরি করে চাষ করতে পারেন, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। কোটচাঁদপুরে এই প্রকল্পটি শুরু হয়েছে ২০২৪ সাল থেকে। এ পর্যন্ত এই উপজেলায় ৪টি পলি শেড নির্মাণ করে দিয়েছে বিএডিসি। এর মধ্যে একটি শেডে উৎপাদন শুরু হয়েছে। আশা করছি বাকি শেডগুলোও খুব দ্রুত উৎপাদনে যাবে।’
- বিষয় :
- চাষ