তনু হত্যা মামলা
জামিনে মুক্ত অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর
সোহাগী জাহান তনু
কুমিল্লা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০২৬ | ২১:০৭
আলোচিত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া একমাত্র সন্দেহভাজন আসামি সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি বের হন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. শাহ আলম খান। তিনি বলেন, ‘গত রোববার হাইকোর্ট থেকে হাফিজুর রহমানের জামিনের আদেশ হয়েছে। মঙ্গলবার কুমিল্লা চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে জামিনের কাগজপত্র পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।’
এর আগে গত ২১ এপ্রিল রাতে ঢাকার কেরানীগঞ্জের নিজ বাসা থেকে হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক তরিকুল ইসলামের নেতৃত্বে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের তিন মাস ১৪ দিনের মাথায় তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন।
আদালত সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারের পরদিন হাফিজুর রহমানকে কুমিল্লার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মমিনুল হকের আদালতে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে আদালত তার তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। পরে তাকে ঢাকায় পিবিআইয়ের বিশেষ ইউনিটে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ
পিবিআই সূত্র জানায়, তনুর পরিধেয় পোশাক থেকে পাওয়া নমুনার ডিএনএ বিশ্লেষণে একাধিক পুরুষের সম্পূর্ণ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। এসব প্রোফাইলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে মামলার সন্দেহভাজন দুই ব্যক্তির রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ পরীক্ষার আবেদন করা হয়। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ জুলাই কুমিল্লার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মমিনুল হক দুই সন্দেহভাজনের ডিএনএ পরীক্ষার অনুমতি দেন। তারা হলেন- কুমিল্লা সেনানিবাসের সাবেক সৈনিক মো. জাহিদুল ইসলাম (৪১) এবং ফয়সাল আহমেদ ওরফে রাব্বী (৩২)।
দুইজনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ
তনু হত্যা মামলায় পলাতক দুই সন্দেহভাজন সার্জেন্ট (অব.) জাহিদুজ্জামান ওরফে জাহিদ এবং সৈনিক শাহীন আলমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। একই সঙ্গে তাদের গ্রেপ্তারে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির আদেশ দেওয়া হয়েছে।
পিবিআই জানায়, তনু হত্যার সময় সার্জেন্ট জাহিদ কুমিল্লা সেনানিবাসের ১২ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন। তার বাড়ি বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জে। আর সৈনিক শাহীন আলম কর্মরত ছিলেন সেনানিবাসের ২ সিগন্যাল ব্যাটালিয়নে। তার বাড়ি কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায়। বর্তমানে দুজনই পলাতক রয়েছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘হাফিজুর রহমান জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, বিষয়টি আদালতের মাধ্যমে জেনেছি। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সন্দেহভাজন অন্যদের আটক এবং ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।’
হাফিজুর রহমানের ডিএনএ প্রোফাইল তনুর ডিএনএর সঙ্গে মিলেছে কি না—এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তদন্ত কর্মকর্তা।
তনুর বাবা ইয়ার হোসেন সমকালকে বলেন, ‘হাফিজুর কারাগার থেকে বের হয়ে গেছেন বলে জেনেছি। মামলার তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তার জামিনে বের হওয়া বিচারের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। খবরটি জেনে হতাশ হয়েছি। আমরা নিরীহ মানুষ, সরকারের কাছে ন্যায়বিচার চাই।’
আট বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত
২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় টিউশনি করতে গিয়ে নিখোঁজ হন তনু। পরদিন সেনানিবাসের একটি জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় তনুর বাবা ইয়ার হোসেন কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। প্রথমে থানা পুলিশ, পরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও সিআইডি দীর্ঘ সময় তদন্ত করলেও হত্যার রহস্য উদঘাটন হয়নি।
২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি জানায়, তনুর পোশাক থেকে পাওয়া নমুনায় তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়া গেছে। তবে সে সময় সন্দেহভাজনদের সঙ্গে ডিএনএ প্রোফাইল মিলিয়ে দেখা হয়নি।
২০২০ সালের ২১ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলার নথি পিবিআইয়ের ঢাকা সদর দপ্তরে হস্তান্তর করা হয়। এরপর থেকে পিবিআই মামলাটি তদন্ত করছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মামলার ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্বে রয়েছেন পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম।