ইকো কনটেইনার পোর্ট নির্মাণে এক বছরেও গতি নেই
লৌহজংয়ের শিমুলিয়া ঘাট এলাকা। ড্রোন দিয়ে তোলা সংগৃহীত
মিজানুর রহমান ঝিলু, লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ)
প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার এক সময়কার ব্যস্ত শিমুলিয়া ফেরিঘাট এলাকা অব্যবহৃত পড়ে আছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) মালিকানায় সেখানে আছে ২৯ দশমিক ৩১ একর জমি। সেই জমিকে নতুন করে কাজে লাগিয়ে জেলার অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটানোর উদ্যোগ নিয়েছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। পাঁচজন উপদেষ্টা এসে সভা করে পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। এক বছরের বেশি সময় পরও এ নিয়ে আর কোনো অগ্রগতি হয়নি। নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার আশা দেখা ব্যবসায়ীরা আছেন অপেক্ষায়।
অব্যবহৃত পড়ে থাকা শিমুলিয়া ফেরিঘাট এলাকায় ইকো কনটেইনার পোর্ট নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। ২৯ দশমিক ৩১ একর জায়গায় ৭৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে এই বন্দর নির্মাণের প্রকল্প বাস্তবায়নের রূপরেখাও ঘোষণা করা হয়েছিল।
এ নিয়ে গত বছরের ২২ জুন শিমুলিয়া ফেরিঘাটে বিআইডব্লিউটিএর কার্যালয়ে আলোচনা সভা হয়। শিমুলিয়া ফেরিঘাটের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আয়োজিত ওই আলোচনা সভায় অন্তর্বর্তী সরকারের পাঁচ উপদেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা অংশ নেন। সভায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, শিল্প এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন অংশ নিয়েছিলেন।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বিআইডব্লিউটিএর সেই সময়ের চেয়ারম্যান কমোডর আরিফ আহমেদ মোস্তফা, পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি, মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ পুলিশ ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা।
ইকো পোর্টের পাশাপাশি ওই এলাকায় রিভার মিউজিয়াম, ইকো রিসোর্ট, সুইমিংপুল, কিডস জোন ও পুরোনো ঐতিহ্য ধরে রাখতে একটি ফেরিঘাট পুনঃস্থাপন নিয়ে সভায় আলোচনা হয়। পরে এম সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, বিআইডব্লিউটিএর যতটুকু জায়গা আছে, সেখানে আন্তর্জাতিক মানের ইকো কনটেইনার পোর্ট হবে। আমরা এখন পরিকল্পনা করছি। কিন্তু কবে হবে, সেটি বলা মুশকিল। পোর্টের জায়গায় শুধু পোর্টই হবে।
তিনি আরও জানিয়েছিলেন, সরকার নিজ অর্থায়নেই এই কনটেইনার পোর্ট নির্মাণ করবে এবং পর্যটন খাতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি) নিশ্চিত করা হবে।
এক সময় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের পদ্মা পাড়ি দেওয়ার অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল মাওয়া-শিমুলিয়া ফেরিঘাট। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে ঘাটটি কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে এখানে ঘুরতে আসা পর্যটকদের গাড়ির পার্কিং জোন ছাড়াও অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে দোকানপাট।
পদ্মা সেতু চালুর পর শিমুলিয়া ঘাটের অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্য অনেকটাই ঝিমিয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা আশা করেছিলেন, ইকো পোর্টটি নির্মিত হলে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন জোয়ার আসবে, সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান। কিন্তু প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতা সেই আশার প্রদীপ নিভিয়ে দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ইকো পোর্ট কেবল লৌহজংয়ের নয়, বরং সমগ্র মুন্সীগঞ্জ জেলার অর্থনৈতিক রূপান্তরের নিয়ামক হতে পারে। তাই প্রশাসনিক জটিলতা দ্রুত নিরসন করে দরপত্র আহ্বান ও নির্মাণকাজ শুরুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
শিমুলিয়া ঘাট রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি মো. মুরাদ হোসেন বলেন, ব্যবসায়ীরা বর্তমানে এখানে ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। ইকো পোর্ট হলে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে এখানে বিপুল অর্থের বিনিয়োগ হবে। সেই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক লোকের কর্মসংস্থান হবে।
লৌহজংয়ের বাসিন্দা ও নান্নু স্পিনিং মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিএম শোয়েব বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের পাঁচজন উপদেষ্টা শিমুলিয়া ঘাটে গিয়ে যে পরিকল্পনার কথা বলে এসেছেন, সেসব বাস্তবায়ন হলে মুন্সীগঞ্জের অনেক ধনাঢ্য ও শিল্পপতি সেখানে বিনিয়োগ করবেন বলে আমি বিশ্বাস করি। ইকো কনটেইনার পোর্ট হলে মুন্সীগঞ্জ জেলার অর্থনীতি ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধি লাভ করবে।
লৌহজংয়ের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ববি মিতু বলেন, গত বছর পাঁচ উপদেষ্টা এসে ইকো পোর্ট নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে নতুন মন্ত্রীরা দায়িত্ব নিয়েছেন। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে আমরা আশা করছি। খুব শিগগিরই এই আন্তর্জাতিক মানের পোর্ট নির্মাণকাজ শুরু হবে।
- বিষয় :
- শিমুলিয়া ঘাট