ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেয়েকে কোলে নেওয়ার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল রুবেলের, ফিরছেন কফিনে

মেয়েকে কোলে নেওয়ার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল রুবেলের, ফিরছেন কফিনে
×

সৌদি আরবের রিয়াদে সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত রুবেলের বাড়িতে এখন শোকের ছায়া। ছবি: সমকাল

নওগাঁ ও রাণীনগর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ১৪:৩০

মাত্র ১৪ দিন আগে ঘর আলো করে জন্ম নেয় রুবেল হোসেনের (২৫) প্রথম সন্তান আয়েশা জান্নাতি। সুদূর সৌদি আরবে বসে ভিডিও কলে মেয়ের মুখ দেখতেন আর অপেক্ষা করতেন- কবে দেশে ফিরবেন, কবে ছোট্ট মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে ধরবেন। সেই অপেক্ষার দিন গুনতে গুনতেই ভয়াবহ আগুনে পুড়ে নিভে গেল রুবেলের প্রাণ। মেয়েকে একবারও কোলে নেওয়া হলো না তার। এখন বাবার মুখ চেনার আগেই বাবাহারা হলো ১৪ দিনের আয়েশা জান্নাতি।

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার গন্ডগোহালী গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে রুবেল হোসেন। প্রায় নয় বছর আগে জীবিকার তাগিদে সৌদি আরবে পাড়ি জমান তিনি। পরিবারের স্বচ্ছলতার আশায় দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকে কাজ করছিলেন। আড়াই বছর আগে দেশে ফিরে বিয়ে করেন। এরপর দ্বিতীয়বারের মতো ছয় মাসের ছুটিতে দেশে আসেন। ছুটি শেষে প্রায় চার মাস আগে আবার সৌদি আরবে চলে যান।

এরই মধ্যে তার ঘর আলো করে আসে কন্যাসন্তান। মেয়ের জন্মের খবর তাকে যেমন আনন্দিত করেছিল, তেমনি বাড়িয়ে দিয়েছিল দেশে ফেরার আকাঙ্ক্ষা। প্রতিদিন মোবাইল ফোনে ভিডিও কলে মেয়েকে দেখতেন। দূর থেকে মেয়ের মুখ দেখে যেন বাবার মন ভরে উঠত না। তাই অল্পদিনের মধ্যেই আবার ছুটি নিয়ে দেশে ফেরার পরিকল্পনা ছিল তার। মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরবেন- এটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় অপেক্ষা।

রুবেলের বাবা সাইদুর রহমান বলেন, ‘মেয়েটা জন্মের পর রুবেল খুব খুশি ছিল। ভিডিও কলে মেয়েকে দেখত আর বলত, দ্রুত দেশে এসে মেয়েকে কোলে নেবে। কিন্তু সেই সুযোগ আর পেল না। এখন আমার ছেলের মেয়েটা বড় হবে বাবাকে ছাড়াই।’

রোববার বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সৌদি আরবের রিয়াদের খোরদাম শহরের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এতে কারখানায় কর্মরত অন্তত ১৬ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন। তাদের মধ্যে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের অন্তত ১৩ জন রয়েছেন বলে স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

নিহতদের মধ্যে রয়েছেন- আত্রাই উপজেলার পারকাসুন্দা গ্রামের মৃত তমেজ উদ্দিনের ছেলে মো. জালাল, ডুবাই গ্রামের বাদলের ছেলে মো. সুমন হোসেন, একই গ্রামের চঞ্চলের ছেলে মো. হাসিবুল হাসান শুভ, গন্ডগোহালী গ্রামের গুফফার প্রামাণিকের ছেলে মো. মোহন প্রামাণিক ও মো. সুমুন প্রামাণিক, একই গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে মো. রুবেল হোসেন, ফজলুর ছেলে মো. কলিউদ্দিন প্রামাণিক, উদনপৈ গ্রামের ময়েন শেখের ছেলে মো. ফরিদ শেখ, মাদবপুর গ্রামের মজনু মিয়ার ছেলে মো. মজিদুল ইসলাম, ডুবাই গ্রামের সোহেল রানা, মধ্যেবোয়ালিয়া গ্রামের মো. মিনহাজ এবং খরসতী গ্রামের মো. মহিদুল ইসলাম।

রুবেলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গন্ডগোহালী গ্রামের বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। যে ঘরে ১৪ দিন আগে নতুন অতিথির আগমনে আনন্দের বন্যা বয়ে গিয়েছিল, সেই ঘরেই এখন কান্নার রোল।

প্রবাসে যাওয়ার পর দীর্ঘ নয় বছর ধরে পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জন করেছেন রুবেল। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা না ভেবে পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন। বিয়ের পর স্ত্রীকে রেখে আবারও প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন। আর এবার দেশে ফেরার কথা ছিল স্ত্রী ও নবজাতক মেয়েকে নিয়ে নতুন করে সংসারের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে গেল। অবশেষে ফিরছেন কফিনবন্দি হয়ে।

আরও পড়ুন

×