দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ট্রেন চালু, সময়সূচিতে হতাশ যাত্রীরা
ছবি-সংগৃহীত
গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৭ | আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২৬ | ১০:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ঢাকা-গোপালগঞ্জ রুটে কমিউটার ট্রেন চলাচল শুরু করেছে। গত সোমবার বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে ঢাকার কমলাপুর থেকে ‘অভিযাত্রী কমিউটার’ ট্রেনটি গোপালগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে আসে। ট্রেনটি সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে গোপালগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছায়।
এর মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতু হয়ে গোপালগঞ্জের সঙ্গে ঢাকার সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ স্থাপিত হলো। পরে আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাত ৮টা ৫ মিনিটে ট্রেনটি ঢাকার উদ্দেশে গোপালগঞ্জ স্টেশন ছেড়ে যায়।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, শনিবার ছাড়া সপ্তাহের ৬ দিন এই রুটে ট্রেন চলাচল করবে। ট্রেনটিতে প্রাথমিকভাবে ৬০৯টি আসন রয়েছে। গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকার ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১৪৫ টাকা। গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকায় যেতে সময় লাগবে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা।
নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, প্রতিদিন বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে ঢাকা থেকে ছেড়ে সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে গোপালগঞ্জে পৌঁছাবে ট্রেনটি। গোপালগঞ্জ থেকে সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে ছেড়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকায় পৌঁছাবে। পথে ৯টি স্টেশনে যাত্রাবিরতি করবে ট্রেনটি। এই রেলযোগাযোগ চালু হওয়ায় সোমবার বিকেল থেকেই গোপালগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। প্রথম দিনের ট্রেনে যাত্রা করতে অনেকে আগেভাগেই স্টেশনে আসেন। নতুন এই রেলযোগাযোগ ঘিরে স্টেশনে উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যায়।
স্থানীয়রা বলছেন, সরাসরি ট্রেন চালু হওয়ায় ঢাকা-গোপালগঞ্জ যাতায়াত সহজ ও সাশ্রয়ী হবে। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে ঢাকায় যাতায়াতকারী মানুষের সময় ও খরচ কমবে। তবে যাত্রীদের সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে ট্রেনের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হলে সেবাটি আরও কার্যকর হবে বলে মনে করছেন তারা।
প্রথম দিনের যাত্রী হিসেবে ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জে আসেন গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য সেলিমুজ্জামান সেলিম, গোপালগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য এসএম জিলানী ও গোপালগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. কে এম বাবর। পরে গোপালগঞ্জ রেলস্টেশনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁরা ঢাকা-গোপালগঞ্জ সরাসরি ট্রেন চলাচল উদ্বোধন করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক আরিফ-উজ-জামান, পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ, জেলা পরিষদের প্রশাসক ও গোপালগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা শরীফ রফিকউজ্জামান, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট কাজী আবুল খায়ের প্রমুখ।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার খাটিয়াগড় ইউনিয়নের জাকির হোসেন স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে প্রথম দিনের ট্রেনে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করতে স্টেশনে আসেন। তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু অনুভূতি আছে, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। অনেক প্রতীক্ষার পর গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকার ট্রেন চালু হওয়ায় আমরা উচ্ছ্বসিত। স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় একটি কাজে যাব, তাই প্রথম দিনের ট্রেনের দুটি টিকিট কেটেছি।’ তবে তাদের দাবি, বর্তমান সময়ের পাশাপাশি সকালে আরেকটি ট্রেন চালু করা হোক, অথবা বর্তমান ট্রেনের সময় পরিবর্তন করা হোক। এটি শুধু তাঁর নয়, গোপালগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা।
গোপালগঞ্জ সরকারি কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শাবনুর খানম জানান, ঢাকা-গোপালগঞ্জ রুটে ট্রেন চালু হওয়ায় বেশি উপকৃত হবেন শিক্ষার্থীরা। চাকরির পরীক্ষা ও বিভিন্ন প্রয়োজনে ঢাকায় যেতে হয়। বাসে যেখানে প্রায় ৫০০ টাকা ভাড়া লাগে, সেখানে ট্রেনে মাত্র ১৪৫ টাকায় যাওয়া যাবে। এতে খরচ কমার পাশাপাশি যানজটের কারণে পরীক্ষা দিতে দেরি হওয়ার ঝুঁকিও কমবে। তিনি বলেন, ‘সকালে গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকার উদ্দেশে ট্রেন ছাড়লে শিক্ষার্থী ও নারী যাত্রীদের জন্য বেশি সুবিধা হতো। সময়সূচি কিছুটা এগিয়ে এনে সন্ধ্যার আগেই ঢাকায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হলে আমাদের জন্য আরও সুবিধা হবে।’
সদর উপজেলার গোলাবাড়িয়া ইউনিয়নের মাছ ব্যবসায়ী মতালেব ফকির বলেন, ‘সকাল ৭টার দিকে গোপালগঞ্জ থেইকা ট্রেন ছাড়লে আমরা মাছ-কাঁচামাল লইয়া ঢাকায় যাইতে পারতাম, আবার দিনের মধ্যেই ফিরা আইতে পারতাম। কিন্তু সন্ধ্যায় ট্রেন ছাড়লে ঢাকায় গিয়া রাইত থাকতে হইব। তাতে হোটেল ভাড়া লাগব, আর মাছ নিয়াও চিন্তায় থাকতে হইব।’
গোপালগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশনমাস্টার রত্না বৈদ্য জানান, ট্রেনটিতে প্রাথমিকভাবে ৬০৯টি আসন রয়েছে এবং শনিবার ছাড়া সপ্তাহের ছয় দিন চলবে। গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকার ভাড়া ১৪৫ টাকা। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার যাত্রাপথে ট্রেনটি কয়েকটি স্টেশনে থামবে।
ঢাকা-গোপালগঞ্জ রেলযোগাযোগ প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১০ সালে। রাজবাড়ী-গোপালগঞ্জ-টুঙ্গিপাড়া রেলপথ নির্মাণ ও সংস্কার শেষে ২০১৮ সালের নভেম্বরে রেলপথটি উদ্বোধন করা হয়। প্রায় ২ হাজার ১১০ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত ওই প্রকল্পের পর গোপালগঞ্জ-রাজশাহী রুটে ট্রেন চালু করা হয়। তখন গোপালগঞ্জের সঙ্গে ঢাকার সরাসরি যাত্রীবাহী ট্রেন চালু হয়নি।
- বিষয় :
- ট্রেন
- রেল যোগাযোগ