ঢাকা শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬

রূপগঞ্জ

গ্যাসের চাপ না থাকায় থমকে গেছে কারখানার চাকা

গ্যাসের চাপ না থাকায় থমকে গেছে কারখানার চাকা
×

ছবি: সংগৃহীত

রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:০৯ | আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:০৯

দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে তীব্র গ্যাস সংকটে থমকে গেছে শিল্পের স্বাভাবিক গতি। দিনের ১৮ থেকে ১৯ ঘণ্টাই প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় কোথাও উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে, কোথাও কারখানার মেশিন বন্ধ রেখে শ্রমিক-কর্মচারীদের বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে। উৎপাদন কমলেও শ্রমিকের মজুরি, ব্যাংকঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য ব্যয় বহাল থাকায় প্রতিদিনই বাড়ছে লোকসান। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কারখানা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়বে। এতে ভবিষ্যতে শ্রমিক ছাঁটাই ও কর্মসংস্থান সংকটের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত গ্যাস সংকটের কারণে রূপগঞ্জে কোনো নির্দিষ্ট কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। মালিকরা ব্যাপক লোকসান গুনেও প্রতিষ্ঠানগুলো সচল রাখার চেষ্টা করছেন।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসের স্বল্পচাপে রূপগঞ্জসহ নারায়ণগঞ্জের অন্তত ২২টি শিল্পকারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্পিনিং, নিটিং, ডাইং, টেক্সটাইল ও পোশাকশিল্প। গ্যাসনির্ভর মেশিন ও ক্যাপটিভ জেনারেটর স্বাভাবিকভাবে চালাতে না পারায় অনেক কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারছে না। কোথাও বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করা হলেও এতে উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে।

রূপগঞ্জের ভুলতা এলাকার লিটল স্টার স্পিনিং মিলের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, তিন সপ্তাহ ধরে গ্যাসের চাপ খুবই কম। উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রতি পাউন্ড সুতায় তাদের ২৭ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। কারখানাটির অনুমোদিত গ্যাসচাপ ১০ পিএসআই হলেও পিক আওয়ারে তা নেমে আসে প্রায় এক থেকে দেড় পিএসআইয়ে। কখনও কখনও লাইনে গ্যাসও থাকে না। এতে দৈনিক ২৬ হাজার পাউন্ড সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে উৎপাদন প্রায় ১৫ হাজার পাউন্ডে নেমে এসেছে।

রূপগঞ্জের কাতরারচকের গ্রামটেক নিট ডাইং অ্যান্ড ফিনিশিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সিনিয়র ম্যানেজার আইয়ুব হোসেন বলেন, গ্যাসের প্রেসার এতটাই কম যে স্বাভাবিকভাবে জেনারেটর চালানো যাচ্ছে না। কারখানা সচল রাখতে সিএনজি স্টেশন থেকে বোতলে করে গ্যাস কিনে এনে পাইপের সঙ্গে সংযোগ দিয়ে জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এরপরও মাঝেমধ্যে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

বরপা এলাকার একটি নিটিং, ডাইং ও ফিনিশিং কারখানার এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, গ্যাসের চাপ কম থাকায় জেনারেটর চালাতে ডিজেল ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে মাসে প্রায় এক কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। তারপরও উৎপাদন কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ।

শুধু বড় শিল্পকারখানা নয়, গ্যাস সংকটে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে রূপগঞ্জের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোও। উপজেলার চারটি ফিলিং স্টেশনের সব কটিতেই স্বাভাবিকভাবে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কোনো কোনো দিন গভীর রাতে মাত্র পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা গ্যাস পাওয়া যায়। দিনের বাকি ১৮ থেকে ১৯ ঘণ্টা স্টেশনগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে মালিকদের যেমন লোকসান গুনতে হচ্ছে, তেমনি গ্যাসের অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে চালকদের। অনেককে বিকল্প এলাকায় গিয়ে গ্যাস সংগ্রহ করতে হচ্ছে।

রংধনু ফিলিং স্টেশনের প্রকৌশলী মশিউর রহমান জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে ১৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। গ্যাস সংকটের কারণে দীর্ঘসময় স্টেশন বন্ধ থাকলেও এখন পর্যন্ত কাউকে ছাঁটাই করা হয়নি। মালিকপক্ষ প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখতে লোকসান বহন করছেন। সংকট কেটে গেলে প্রতিষ্ঠানটি আবার লাভজনক অবস্থায় ফিরবে—এই আশাতেই কর্মীদের ধরে রাখা হয়েছে।

রূপগঞ্জের অন্য তিনটি গ্যাস ফিলিং স্টেশনের চিত্রও প্রায় একই। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের আয় কমে গেলেও কর্মরতদের চাকরি ধরে রাখার চেষ্টা করছেন মালিকরা। তবে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কর্মসংস্থান নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে।

নাবিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক নাঈম ভূঁইয়া বলেন, তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টাই উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। প্রায় এক হাজার ২০০ শ্রমিকের হাতে পর্যাপ্ত কাজ না থাকলেও তাদের বেতন দিতে হচ্ছে। এভাবে লোকসান অব্যাহত থাকলে প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

শাহরিয়ার টেক্সটাইলের মালিক তারিকুল ইসলাম শাকিল ভূঁইয়া বলেন, গ্যাস সংকট এখন জাতীয় দুর্যোগের মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সরকার দ্রুত এ সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারলে বেশিদিন কারখানা সচল রাখা সম্ভব হবে না। মাস শেষে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। বর্তমানে কারখানার চার ভাগের এক ভাগ চালু রেখে বাকি অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে কোনো শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়নি। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দ্রুত পুরো কারখানা চালু করা হবে।

মশিউর স্পিনিং অ্যান্ড টেক্সটাইলের মালিক মশিউর রহমান ভূঁইয়া বলেন, গ্যাস না থাকায় তাদের গ্যাসচালিত জেনারেটর প্রায় সারাদিন বন্ধ থাকে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না এবং লোডশেডিংয়ের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। প্রায় ২ হাজার শ্রমিকের কাউকেই এখন পর্যন্ত ছাঁটাই করা হয়নি। কিন্তু প্রায় ১২ ঘণ্টা কাজ না থাকলেও তাদের বসিয়ে রেখে বেতন দিতে হচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে একসময় রূপগঞ্জের অনেক কারখানা বন্ধ করে দিতে মালিকরা বাধ্য হতে পারেন। দ্রুত এ সমস্যা সমাধানে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এম জেড স্পিনিংয়ের একজন জেনারেটর প্রকৌশলী বলেন, গ্যাস না থাকায় জেনারেটর চালানো যাচ্ছে না। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। মালিকপক্ষ কর্মীদের বসিয়ে রেখেও বেতন দিচ্ছেন। এতে প্রতি মাসে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে। এভাবে আর কতদিন কর্মীদের বসিয়ে রেখে বেতন দেওয়া সম্ভব হবে, তা নিয়ে তারাও উদ্বিগ্ন। অনেক শ্রমিক-কর্মচারী নিজেদের কর্মসংস্থান নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

এ-ওয়ান পোলার লিমিটেডের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মো. শাহেদ হোসাইন বলেন, গ্যাস সংকটের প্রভাব শ্রমিকদের আয়েও পড়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় অতিরিক্ত সময়ের কাজ বন্ধ রয়েছে। ফলে শ্রমিকদের বাড়তি আয় কমে গেছে।

শিল্প মালিকদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, উৎপাদন কমলেও স্থায়ী ব্যয় কমছে না। শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকঋণের সুদ, কারখানা রক্ষণাবেক্ষণ, কাঁচামাল ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় ঠিকই বহন করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিকল্প জ্বালানির বাড়তি খরচ। ফলে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে প্রতি ইউনিট পণ্যের উৎপাদন ব্যয়।

গ্যাস সংকটে রপ্তানিমুখী শিল্পেও উদ্বেগ বাড়ছে। নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার হারানোর আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে স্পিনিং, নিটিং ও ডাইং শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হলে এর প্রভাব পড়ে তৈরি পোশাকের পুরো সরবরাহব্যবস্থায়।

বিটিএমএ’র সাবেক সহসভাপতি মো. সালেউদ জামান খান বলেন, রূপগঞ্জ দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। এখানকার উৎপাদন ব্যাহত হলে এর প্রভাব রপ্তানি আয় ও জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়বে। গ্যাস সংকটের কারণে পরিবহন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই, দ্রুত এ সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, সাময়িকভাবে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে কারখানা চালু রাখা সম্ভব হলেও দীর্ঘদিন এভাবে উৎপাদন চালানো সম্ভব নয়। এতে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে, রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং কর্মসংস্থানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। রূপগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে এখন সংকটটি শুধু গ্যাসের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে উৎপাদন, বিনিয়োগ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ।

সংশ্লিষ্ট গ্যাস বিতরণকারী সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং লাইনের সংস্কারকাজ চলমান থাকায় সাময়িকভাবে গ্যাসের চাপ কমেছে। সংস্কারকাজ শেষ হলে ধীরে ধীরে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছেন তারা।

উদ্যোক্তাদের দাবি, লোকসান দিয়ে হলেও তারা এখন পর্যন্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের ধরে রেখেছেন। কিন্তু গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত না হলে সেই অবস্থান কতদিন ধরে রাখা সম্ভব হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাই, শিল্পকারখানা ও কর্মসংস্থান রক্ষায় দ্রুত প্রয়োজনীয় চাপসহ নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

আরও পড়ুন

×