মুক্তি পেলেন ‘ভুল পরিচয়ে’ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাভোগ করা সোনা মিয়া
সোনা মিয়াকে ফুল দিয়ে বরণ করে নিচ্ছেন স্বজনরা
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৩:১৩ | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৩:১৬
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামির পরিচয়সংক্রান্ত জটিলতায় কারাভোগ করা সোনা মিয়াকে কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার সকাল ১১টার দিকে তিনি কারাগার থেকে বের হন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেলার মো. দেলোয়ার জাহান।
এর আগে বৃহস্পতিবার কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মো. আব্দুর রহিমের আদালত চারটি শর্তে সোনা মিয়াকে কারামুক্তির আদেশ দেন। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে শুক্রবার সকালে তাকে মুক্তি দেয় কারা কর্তৃপক্ষ।
কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেলার মো. দেলোয়ার জাহান জানান, কারান্তরীণ সোনা মিয়াকে মুক্তি দিতে কিছু নির্দেশনাসহ আদালতের আদেশ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কারাগারে আসে। শুক্রবার সকালে সকল আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বেলা ১১টার দিকে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
জেলার বলেন, ‘সবার সহযোগিতায় একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে নিশ্চিত মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচাতে পারলাম আমরা। সোনা মিয়া যখন কারাগারে এলেন, তখন রোলকলে তিনি জানতে চান কী অপরাধে তাকে কারাগারে আনা হয়েছে? তখন তাকে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তারের কথা জানানো হলে তিনি বিস্মিত হন। পরে পুরোনো নথিতে থাকা ছবি, পরিচয় ও অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে তার তথ্য মিলিয়ে গরমিল পাওয়া যায়। বিষয়টি আদালতকে জানানো হলে শুরু হয় তদন্ত।’
এদিকে সোনা মিয়াকে মুক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালত চারটি শর্ত দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে—সোনা মিয়াকে তার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্ট আদালতে জমা দিতে হবে, নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিদেশ যেতে পারবেন না এবং প্রতি মাসের প্রথম মঙ্গলবার কক্সবাজার সদর থানায় হাজির হয়ে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া প্রতি তিন মাস পর সোনা মিয়ার উপস্থিতি ও অবস্থান সম্পর্কে প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে সদর থানাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নাজির মো. বেদারুল আলম এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার পর সোনা মিয়াকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তার পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা। স্ত্রী, সন্তান ও মাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। পরে স্বজনেরা তাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন।
কারামুক্তিতে সহযোগিতাকারী সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সোনা মিয়া বলেন, ‘কারাগারের প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে দিনের মতো এবং প্রতিটি দিন বছরের মতো দীর্ঘ মনে হয়েছে। ঘটনার শুরুতেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুষ্ঠু তদন্ত করা হলে তাকে এমন পরিণতির শিকার হতে হতো না বলেও আক্ষেপ করেন তিনি।’
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
২০২০ সালের ১ মার্চ রামু ও কক্সবাজার সদর এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ পাঁচজনকে আটক করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরদিন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মিজানুর রহমান বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। আটকের সময় এক ব্যক্তির পকেটে পাওয়া জন্মনিবন্ধন সনদ ও তার তথ্যের ভিত্তিতে মামলার এজাহারে দুই নম্বর আসামি হিসেবে সোনা মিয়ার নাম উল্লেখ করা হয়।
২০২২ সালের ১৩ জুন মাদক মামলায় কারাবন্দি থাকা সোনা মিয়া পরিচয়ধারী রমজান আলী কক্সবাজারের জেলা জজ আদালত থেকে জামিন পান। কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালত ওই মামলায় সোনা মিয়াসহ পাঁচ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
রায় ঘোষণার পর গত ২৩ জুন গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে র্যাব-১৫-এর একটি দল চকরিয়ার ডুলাহাজারা থেকে প্রকৃত সোনা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তবে তিনি কারাগারে যাওয়ার পরই তার পরিচয় নিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দেয়। একপর্যায়ে অন্য ব্যক্তির পরিচয়ে মামলা ও জামিন নেওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে আসে।
কারাগারে যাওয়ার দুই থেকে তিন দিন পর সোনা মিয়া জেল সুপারের কাছে আবেদন করে দাবি করেন, তিনি ওই মামলার আসামি নন। এরপর জেল সুপার মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া সোনা মিয়ার ছবি, আঙুলের ছাপ, ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করেন। এতে দুই ব্যক্তির তথ্যের মধ্যে গরমিল পাওয়া যায়।
পরে জেল সুপার বিষয়টি লিখিতভাবে জেলা ও দায়রা জজকে জানান। আদালত ঘটনা যাচাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সার্বিক তথ্য-প্রমাণ বিবেচনা করে আদালত চারটি শর্তে সোনা মিয়াকে কারামুক্তির আদেশ দেন।