ঢাকা শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬

ধর্মীয় রীতিতে বিয়ের পর অস্বীকার নববধূর, ধর্ষণ মামলায় কারাগারে যুবক

ধর্মীয় রীতিতে বিয়ের পর অস্বীকার নববধূর, ধর্ষণ মামলায় কারাগারে যুবক
×

ফরিদপুর অফিস

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ১৮:৪৪

ফরিদপুরের নগরকান্দায় ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিতে বিয়ে, গায়ে হলুদ, নাচ-গান ও বরযাত্রার আয়োজনের পরও বিয়ে হয়নি- এমন দাবি করেছেন কিশোরী কনে ও তার পরিবার। অন্যদিকে ছেলের পরিবার বলছে, দুই পরিবারের সম্মতিতে গত ২২ মে ওই কিশোরীর সঙ্গে রুমন খন্দকার (২০) নামের ওই তরুণের বিয়ে হয়। পরে পারিবারিক বিরোধের জেরে তাকে ধর্ষণ মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। শনিবার দুপুরে মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানি আজাদ।

অপহরণের পর ধর্ষণের অভিযোগে করা ওই মামলায় গত ২ জুলাই গ্রেপ্তার হন রুমন। দেড় মাস ধরে তিনি কারাগারে আছেন। তার পরিবার এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছে।

রুমন নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামের বিল্লাল খন্দকারের ছেলে। তিনি পেশায় কাঠমিস্ত্রি।

দুই পরিবারের আয়োজনে বিয়ে
রুমনের পরিবার ও স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি বছরের ২২ মে ডাঙ্গী ইউনিয়নের শংকরপাশা গ্রামের ওই কিশোরীর সঙ্গে রুমনের বিয়ে হয়। বিয়ের আগে কনের বাড়িতে গায়ে হলুদের মতো অনুষ্ঠান করা হয়। পরে প্রায় ৪০ জন বরযাত্রী নিয়ে রুমনের পরিবার কনের বাড়িতে যায়।

সেখানে খাওয়া-দাওয়ার পর দুই পরিবারের স্বজন ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিতে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। পরে কনেকে সাজিয়ে বরের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

তবে কনের বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় বিয়েটি নিবন্ধন করা হয়নি। দুই পরিবারের মধ্যে সিদ্ধান্ত ছিল, কনে প্রাপ্তবয়স্ক হলে বিয়ে নিবন্ধন করা হবে। বিয়ের বিভিন্ন আয়োজনের ছবি ও ভিডিও সাংবাদিকদের সরবরাহ করেছে রুমনের পরিবার।

রুমনের মামা হাফিজুর রহমান বলেন, বিয়ের পর থেকেই তার ভাগনের সঙ্গে কিশোরীর মনোমালিন্য শুরু হয়। সামাজিক রীতি অনুযায়ী কিশোরীকে বাবার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর সে আর শ্বশুরবাড়িতে ফিরতে চাইছিল না।

হাফিজুর রহমানের দাবি, পরে তারা জানতে পারেন, কিশোরীর অন্য একজনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় তাকে একবার রুমনের বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হলেও কয়েক দিন পর আবার বাবার বাড়িতে চলে যায়। এরপর কিশোরীর পরিবার তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।

হঠাৎ গ্রেপ্তার
রুমনের মামা বলেন, এর প্রায় এক মাস পর ২ জুলাই গভীর রাতে পুলিশ তাদের বাড়িতে এসে রুমনকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। পরদিন থানায় গিয়ে তারা জানতে পারেন, ধর্ষণের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অন্যদিকে পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২ জুলাই জহুরন খাতুন (৫২) নামের এক নারী রুমনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তিনি ওই কিশোরীর দাদি।

এজাহারে বলা হয়, গত ১৯ জুন বিকেল পাঁচটার দিকে বাড়ির পাশ থেকে কিশোরীকে একটি মাইক্রোবাসে করে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে রুমনের বাড়িতে নিয়ে ধর্ষণ করা হয় এবং শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে আঘাত করা হয়। পরদিন সকালে কৌশলে ওই বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে কিশোরী বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের জানায়। পরে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

তবে কিশোরী ও মামলার বাদী জহুরন খাতুনের সঙ্গে কথা বললে তারা কোনো বিয়ে হওয়ার কথা অস্বীকার করেন। তারা মামলার এজাহারে দেওয়া অভিযোগের কথা তুলে ধরে ধর্ষণের ঘটনায় বিচার দাবি করেন। বিয়ের অনুষ্ঠান ও এ-সংক্রান্ত ছবি ও ভিডিও সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা এড়িয়ে যান।

পুলিশের বক্তব্য
নগরকান্দা থানার ওসি রাসুল সামদানি আজাদ বলেন, ২ জুলাই জহুরন খাতুন তার নাতনিকে নিয়ে থানায় আসেন। তার সঙ্গে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের চিকিৎসার ছাড়পত্রও ছিল। সেখানে ধর্ষণের বিষয় উল্লেখ রয়েছে।

ওসি বলেন, লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা নেওয়া হয়েছে। মামলার এজাহারে বিয়ের কোনো বিষয় উল্লেখ করা হয়নি। পুলিশকেও বিয়ের বিষয়ে জানানো হয়নি।

তিনি আরও বলেন, মেয়েটির বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় আইন অনুযায়ী বিয়ে নিবন্ধনের সুযোগ নেই। সামাজিকভাবে কোনো অনুষ্ঠান হয়ে থাকলেও তা আইনগতভাবে বৈধ বিয়ে নয়। চিকিৎসা-সংক্রান্ত কাগজপত্রসহ ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়ায় পুলিশ গুরুত্ব দিয়ে মামলা করেছে।

মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে উপপরিদর্শক শহিদুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে আদালতে পুলিশ প্রতিবেদন দেওয়া হবে বলে জানান ওসি।

প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, কিশোরীর বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় এটি বাল্যবিয়ে। বিয়েটি নিবন্ধন না করে দুই পরিবার আইন লঙ্ঘন করেছে।

নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আফরিন বলেন, বিয়ের ক্ষেত্রে সামাজিক ও আইনগত সুরক্ষার জন্য নিবন্ধন গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্রথমেই বাল্যবিয়ের মাধ্যমে আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে। বিয়ের নিবন্ধন না থাকায় পরবর্তী সময়ে এ ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে।

তিনি বলেন, কোনো বিয়ে নিবন্ধক বা কাজি এ ঘটনায় জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে ছেলের পক্ষের আইনজীবী মো. ফারুক হোসেনের দাবি, দুই পরিবারের সম্মতিতে বিয়ের পর কিশোরী কিছুদিন রুমনের বাড়িতে সংসার করেছে। পরে পারিবারিক বিরোধের জেরে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে, যা অমানবিক।

তিনি বলেন, বাল্যবিয়ে আইনগতভাবে স্বীকৃত নয়- এটি ঠিক। কিন্তু বিয়ের সামাজিক বাস্তবতা, দুই পরিবারের সম্মতি এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। মামলাটির সুষ্ঠু তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।

আরও পড়ুন

×