বাবাকে হারানোর শোক শক্তিতে বদলে ইতি উপজেলা সেরা
মোসা. ইতি খাতুন
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৪:২৪
দারিদ্র্য আর বাবাকে হারানোর কষ্ট—দুটিই ছিল নিত্যসঙ্গী। সংসারে অভাব, পড়াশোনার পাশাপাশি মাকে সহযোগিতা করতে হয়েছে নানা কাজে। এর মধ্যেই পরীক্ষার শেষ তিনটি বিষয়ের আগে হারিয়েছে বাবাকে। কিন্তু সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে থামেনি পড়াশোনা। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ ৫ পেয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার নয়ালাভাঙ্গা ইউনিয়নের সাবেক লাভাঙ্গা গ্রামের মোসা. ইতি খাতুন। ১ হাজার ২৫০ নম্বরের মধ্যে সে পেয়েছে ১ হাজার ৫৮ নম্বর। উপজেলা পর্যায়ে মানবিক বিভাগে প্রথম হয়েছে ইতি।
ইতি রাণীহাটি এমএল উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তার এই সাফল্যে পরিবার, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দের সৃষ্টি হয়েছে। তবে সাফল্যের আনন্দের আড়ালেই এখন উচ্চশিক্ষা নিয়ে শঙ্কা। চরম অর্থকষ্টের কারণে ভালো কোনো কলেজে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে কিনা, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ইতি ও তার মা।
সম্প্রতি ইতির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, টিনের তৈরি দুটি ছোট ঘরেই তাদের বসবাস। বাড়ির পেছনে একটি চালার নিচে পালন করা হচ্ছে একটি গরু ও কয়েকটি মুরগি। বাবা জাফর আলী মারা যাওয়ার পর সংসারের হাল ধরেছেন মা আকতারা বেগম। চার বোনের মধ্যে দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। বাকি দুই বোনের মধ্যে বড় ইতি এবং ছোট বোন স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম পুরুষ ছিলেন জাফর আলী। একদিন জ্বালানির জন্য বাগানে শুকনো গাছের ডাল কাটতে গিয়ে গুরুতর আহত হন তিনি। মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়ে প্রায় ছয় মাস বিছানায় ছিলেন। ইতি যখন এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছিল, তখনও অসুস্থ বাবা ছিলেন শয্যাশায়ী। পরীক্ষার শেষ তিনটি বিষয়ের আগেই মারা যান তিনি।
স্বামীর পুরোনো সাইকেলটি পরিষ্কার করতে করতে স্বামীর ছবির দিকে তাকিয়ে কাঁদছিলেন আকতারা বেগম। তিনি বলেন, ‘তুমি থাকলে হয়তো তোমার মেয়ের রেজাল্ট শুনে সবচেয়ে বেশি খুশি হতে। দোয়া কর, তোমার মেয়ে যেন অনেক বড় হতে পারে।’
বাবার মৃত্যুর পরও ভেঙে পড়েনি ইতি। মাকে সহযোগিতার পাশাপাশি কাঁথা সেলাই, পশু পালনসহ বিভিন্ন কাজ করে নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাড় করেছে। অনেক সময় কাজের চাপে নিয়মিত স্কুলেও যেতে পারেনি। বিদ্যুৎ না থাকলে কম আলোতে রাত জেগে পড়াশোনা করেছে। কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে বন্ধু ও শিক্ষকদের সহযোগিতা নিয়েছে।
ইতি বলে, ‘কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে উপজেলা পর্যায়ে প্রথম হয়েছি। এতে প্রমাণ হয়েছে, সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে দারিদ্র্য কোনো শিক্ষার্থীর স্বপ্নের পথে বাধা হতে পারে না। আমি ভবিষ্যতে একজন আদর্শ শিক্ষক হতে চাই। বিশেষ করে দরিদ্র শিক্ষার্থীরা যেন অর্থের অভাবে পড়াশোনা থেকে ঝরে না পড়ে, সে জন্য কাজ করতে চাই।’
প্রতিবেশী ও স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষক কাউসার আলী বলেন, বাবাকে হারানোর শোক, সংসারের অভাব ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ইতি পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। কাজের কারণে অনেক সময় স্কুলে যেতে না পারলে তার কাছে এসে পড়া বুঝে নিত। স্থানীয় একটি কোচিং থেকেও তাকে নোট ও সাজেশন দেওয়া হতো।
প্রতিবেশী সামিমা বেগম বলেন, ইতি গ্রামের সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলে। রেজাল্টের পরও সে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে অর্থাভাব নিয়ে তার মধ্যে হতাশা দেখা যাচ্ছে। উপযুক্ত পরিবেশ ও সহযোগিতা পেলে মেয়েটি অনেক দূর যেতে পারবে।
ইতির বান্ধবী সুমিয়ারা খাতুন বলে, ‘অভাবের কাছে হার না মেনে ইতির এই সাফল্য অন্য দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্যও অনুপ্রেরণা। তার চেয়ে ভালো পরিবেশে থেকেও অনেকে এমন ফল করতে পারেনি।’
ইতির শ্রেণিশিক্ষক মুখলেসুর রহমান বলেন, বাবার অসুস্থতার কারণে অনেক সময় ইতি নিয়মিত স্কুলে আসতে পারেনি। তবে পড়াশোনার প্রতি তার আগ্রহ ছিল প্রবল। নির্বাচনী পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পাওয়ার পর তার প্রতি প্রত্যাশা আরও বেড়ে যায়। এবার মানবিক বিভাগ থেকে স্কুলের একমাত্র গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়েছে ইতি।
রাণীহাটি এমএল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘ইতি খুবই মেধাবী ও পরিশ্রমী। পারিবারিক নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। তার এই সাফল্যে আমরা গর্বিত।’
এখন ইতির সামনে উচ্চশিক্ষার নতুন পথ। মেধা ও পরিশ্রমে এসএসসিতে উপজেলা সেরা হলেও অর্থাভাবে সেই পথ কতটা মসৃণ হবে, তা নিয়ে শঙ্কায় সে ও তার পরিবার। সহযোগিতা পেলে বাবার স্বপ্ন পূরণ করে একদিন আদর্শ শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখছে ইতি।
- বিষয় :
- চাঁপাইনবাবগঞ্জ
- এসএসসি
- ফল প্রকাশ