চট্টগ্রাম
শনাক্তের আগেই হাম ওয়ার্ডে ভর্তি, বাড়ছে সংক্রমণ ঝুঁকি
শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৫৫ | আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৩০
১২ বছরের বর্ণ চৌধুরীর শরীরে হঠাৎ জ্বর। পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৪ ডিগ্রিতে। দুই দিনের মাথায় পিঠে ও রানের দুই চিপায় দেখা যায় ফুসকুড়ি। পরদিন তা ছড়িয়ে পড়ে কয়েকটি স্থানে। স্থানীয় এক চিকিৎসককে দেখানো হলে কয়েক প্রকার ওষুধ দেন। তাতে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। তাই বর্ণকে তার মা-বাবা নিয়ে যান চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে।
চিকিৎসক প্রাথমিকভাবে হামের আশঙ্কা করেন। বর্ণকে ভর্তি করা হয় হাম ওয়ার্ডে। এর দুই দিন পর অন্য চিকিৎসক বর্ণকে দেখে বলেন, ‘ওকে হাম ওয়ার্ডে কেন ভর্তি দেওয়া হয়েছে? এসব ফুসকুড়ি তো হাম নয়।’
পরে হাম ওয়ার্ডের দুই চিকিৎসক আলোচনা করলে সেদিন বিকেলেই বর্ণকে হাম ওয়ার্ড থেকে পাঠানো হয় কেবিনে। তিন দিন পর নমুনা পরীক্ষায় হাম ‘নেগেটিভ’ আসে বর্ণের। অথচ নিশ্চিত না হয়েও হামে আক্রান্ত অন্য শিশুর সঙ্গে কয়েক দিন চিকিৎসা নিতে হয়েছে তাকে। এতে বর্ণ নতুন করে হামে আক্রান্ত হতে পারে– এমন আশঙ্কা করছেন স্বজনরা।
শুধু বর্ণই নয়, তার মতো অনেক শিশুকে পড়তে হচ্ছে এমন সংক্রমণ ঝুঁকিতে। এর প্রধান কারণ চট্টগ্রামে হাম শনাক্তের ব্যবস্থা নেই। এখান থেকে নমুনা পাঠানো হয় ঢাকার পাবলিক হেলথ ইনস্টিটিউটের ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিসেলস-রুবেলা ল্যাবরেটরিতে (এনপিএমএল)। মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের মাধ্যমে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নমুনা পাঠিয়ে রিপোর্ট পেতে কয়েক দিন সময় লেগে যায়। এ অবস্থায় অনুমানের ওপর নির্ভর করে আক্রান্ত না হওয়া অনেক শিশুকেও হামের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এতে শিশুর শারীরিক অবস্থা একদিকে আরও জটিল হচ্ছে, অন্যদিকে পড়তে হচ্ছে নতুন বিপদেও। চট্টগ্রামে হাম শনাক্তে সরকারিভাবে উপযোগী ল্যাব থাকার পরও সাড়ে চার মাসে শুরু করা যায়নি পরীক্ষা কার্যক্রম।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, হাম ও উপসর্গ নিয়ে গত আড়াই মাসে রেকর্ড প্রায় তিন হাজার ৯০০ শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ২৮৬ জন। প্রতিদিন গড়ে নতুন করে ভর্তি হচ্ছে অর্ধশতাধিক। গত ৮ আগস্ট এক দিনেই রেকর্ড ৭৭ জন ভর্তি হয়। ১৩ আগস্ট এ সংখ্যা ছিল ৭৪। ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ভর্তিকৃত রোগীর সংখ্যা ছয় হাজার ১৪৫।
চিকিৎসকদের মতে, হামের ভাইরাস শনাক্ত করতে নমুনা পরীক্ষার জন্য ভাইরোলজি ল্যাবরেটরি বা মলিকুলার ডায়াগনস্টিক মানের ল্যাবের প্রয়োজন হয়। যেখানে আইজিএম (অ্যান্টিবডি) পরীক্ষা এবং আরটি-পিসিআর (আরটি-পিসিআর) পরীক্ষা করার সক্ষমতা রয়েছে। ঢাকার বাইরে এমন সক্ষমতা আছে চট্টগ্রামের ফৌজদারহাটে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেসে (বিআইটিআইডি)। ২০২০ সালের দিকে কভিড-১৯ সংক্রমণের সময় চট্টগ্রামে প্রথম কোনো ল্যাব হিসেবে করোনা শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া এই পরীক্ষাগারেই শুরু হয়েছিল। হামের প্রাদুর্ভাব শুরুর সাড়ে চার মাস চলে গেলেও শুরু করা যায়নি পরীক্ষা কার্যক্রম।
জানতে চাইলে চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. শেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘রোগীর সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী থাকা, পরীক্ষা চালুসহ নানা বিষয় আমরা ঊর্ধ্বতন মহলকে জানিয়েছি। বিআইটিআইডিতে ল্যাব, পর্যাপ্ত জনবলসহ পরীক্ষার সক্ষমতা রয়েছে। তবে ঢাকার পর আর কোথাও পরীক্ষা চালুর সিদ্ধান্ত একমাত্র সরকারই দিতে পারে। তা ছাড়া পরীক্ষা চালু করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমতিসহ বেশ কিছু গাইডলাইন মানার নিয়মও রয়েছে।’
সিভিল সার্জন জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘হাম ও উপসর্গ থাকা শিশুদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে আমরা নানা পদক্ষেপ নিয়েছি। কেউ যাতে ভুল চিকিৎসার শিকার না হয় সেজন্যও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে ডাক্তারদেরও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।’
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ মুসা বলেন, ‘ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া শিশুর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। একেক শিশুর শরীরে উপসর্গ একেক রকম থাকে। ফুসকুড়ি দেখলেই যে হাম, এটি অনেক সময় নাও হতে পারে। এসব বিষয়ের জন্য গবেষণায় বাড়তি নজর দিতে হবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক বলেন, ‘নমুনা সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা শেষে ঢাকা থেকে আসতে সময়ের প্রয়োজন হয়। রিপোর্ট না পাওয়ায় তাই হাম ভেবে অনেক শিশুকে হাম ওয়ার্ডে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। তবে রিপোর্ট পাওয়ার পর অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে হাম নেগেটিভ। হাসপাতালে ভর্তির পর নমুনা পরীক্ষা করা গেলে এমন অবস্থা হতো না।’ আরেক চিকিৎসক বলেন, ‘হামের মতো নানা উপসর্গ থাকা অনেক শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, বাস্তবে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার কারণে এমন উপসর্গ দেখা দিয়েছে। তাদের হাম রিপোর্টও পরবর্তী সময়ে নেগেটিভ আসছে।’
বর্ণ চৌধুরীর মা লিপি চৌধুরী বলেন, ‘এখন আমার সুস্থ ছেলেটা যদি হামে আক্রান্ত হয় তাহলে এর দায়ভার নেবে কে?’
সাড়ে চার বছর বয়সী শিশু মায়মুনের বাবা মো. সোয়েব বলেন, ‘নমুনা নেওয়ার তিন দিন পরও রিপোর্ট আসেনি। অথচ হাম ওয়ার্ডেই সন্তানের চিকিৎসা চলছে। তার চারপাশে হাম শনাক্ত বেশ কয়েকজন শিশু রয়েছে। যা দেখে আমার মেয়ের শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেছে। পাঁচ দিন পর চিকিৎসকরা জানান মায়মুনের হাম হয়নি, তাই তাকে অন্য ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়।’