ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফুলবাড়িয়ায় সন্তোষপুর ইকোপার্ক 

উচ্ছেদ আতঙ্কে কোচ বর্মণরা, জমি হারানোর শঙ্কা অন্যদের

উচ্ছেদ আতঙ্কে কোচ বর্মণরা, জমি হারানোর শঙ্কা অন্যদের
×

ছবি: সমকাল

কবীর উদ্দিন সরকার হারুন, (ফুলবাড়িয়া) ময়মনসিংহ

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৫:১১

‘আমারা তো অত কিছু বুঝি না। কাম করি, নুন-মরিচ দিয়া ভাত খাই। কাম না করলে খাওন বন্ধ। নিজের তো জায়গা নাই। পোলাপান, নাতি লইয়া বনের জায়গায় বাপ-ঠাকুরদার আমলতে এই জঙ্গলে থাহি। অহন মাইনষে কয়, কিয়ের বলে পার্ক অইবো; আমগরে যাওন লাগবো গা। আরে মর জ্বালা! আমরা থাকমু কই! যামু কই! আমগর পার্ক-মার্ক লাগতো না। বনের মানুষ বনেই থাকমু বাপু।’ একটানে কথাগুলো বললেন ৮০ বছরের রূপালী বর্মণ। তাঁর কপালে চিন্তার ভাঁজ; দুই চোখে বিষাদ।

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার সন্তোষপুর বনাঞ্চলে ১০ ঘর কোচ বর্মণ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। একসময় পরিবারের সংখ্যা কয়েকশ থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে অনেকেই দেশ ছেড়েছেন। বনভূমি কমায় জীবিকা সংকটে অন্যত্র চলে গেছে কেউ কেউ। কেবল তিনপুরুষের মায়ায় রয়ে গেছেন রূপালী বর্মণের মতো অল্প কয়েকজন। 

এক ছটাক জমি নেই চাষবাসের। দুই সন্তান জন্মের অল্প কিছুদিনের মধ্যে মারা যান রূপালীর স্বামী। বনের জমিতে কামলা দিয়ে সন্তানদের মানুষ করেছেন। এই বনই তাদের জীবন; বনই তাদের জীবিকা। 

সবুজ ছায়া-সুনিবিড় ছবির মতো গ্রাম সন্তোষপুর বনাঞ্চলকে ইকোপার্কের স্বীকৃতি দিয়ে গত ১৪ আগস্ট গেজেট জারি হয়। প্রকৃতিপ্রেমী, স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশ সচেতন মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল– মধুপুর বনাঞ্চলে গড়ে উঠুক একটি পরিকল্পিত ইকোপার্ক।

সরকারের এ ঘোষণায় বন সংরক্ষণ ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। তবে বনের লিজকৃত জমিতে কৃষিজমি হারানোর শঙ্কা, ইকোপার্ক ঘিরে উচ্ছেদের মতো আতঙ্ক রয়েছে স্থানীয় অনেকের মাঝে। 

সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ৫৬৫ দশমিক ৪৫ একর ভূমিকে ‘সন্তোষপুর ইকোপার্ক’ ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। অনেকেই ইকোপার্কের পক্ষে থাকলেও বনাঞ্চলে বাস করা স্থানীয়দের একটি অংশের অবস্থান ঠিক বিপরীতে। কেননা, এতে তাদের জীবন-জীবিকা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করা যুবক শাহজাহান বলেন, এই বনাঞ্চলে বহুমানের কর্মসংস্থান হয়েছে কৃষিতে। এখানকার উৎপাদিত কলা, আনারস দেশের কৃষি অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছে। হঠাৎ ইকো পার্কের এমন সিদ্ধান্তে সবাই ক্ষুব্ধ। এতে জমিসহ অনেকেই ঘরবাড়ি হারানোর আশঙ্কা করছেন। পার্কটি বাতিলের পক্ষে স্থানীয় অনেকেই।

স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুল হাসান মিলন বলেন, আমাদের নির্বাচনের ইশতেহারে থাকা ইকোপার্কটি বাস্তবায়ন হলে উদ্ভিদ ও প্রাণিবৈচিত্র্য সংরক্ষিত হবে। কোনো উচ্ছেদ নয় বরং স্থানীয়দের অধিকার সংরক্ষণ করেই তাদের সঙ্গে নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে। 
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ নূরুল করিম বলেন, জনগণের বিপরীতে গিয়ে কোনো কাজ করার পরিকল্পনা নেই বন বিভাগের। ইকোপার্ক হলে সামজিক বনায়নের অংশীদাররাই উপকৃত হবে বেশি। 

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সন্তোষপুর, কৃষ্ণপুর ও রাঙ্গামাটিয়া– তিনটি মৌজা মিলিয়ে বনাঞ্চলে বনভূমির পরিমাণ ৩ হাজার ৬৫৯ একর। যেখানে ৫০ একর শালবন ও বেতবাগানের পাশাপাশি সামাজিক বনায়ন রয়েছে ১২শ একর। বনের ১৫শ একরের বেশি জমি এখনও জবরদখলে রয়েছে, যার বেশির ভাগই প্রভাবশালীদের দখলে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মুরাদ আহমেদ ফারুক জানান, ইকোপার্ক প্রকল্প শুরুর আগে সেখানকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের অবস্থান সম্পর্কে জানার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করতে হবে। বন্যপ্রাণীর জন্য একটি নিবিড় জোন থাকবে, যেখানে বন্যপ্রাণীরা অবাধে চলাচল করতে পারে; তাদের প্রজনন থেকে শুরু করে সব কিছুর ব্যবস্থা থাকে। এ ছাড়া স্থানীয় কৃষিতে যাতে কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে আনা হয়, সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে।

আরও পড়ুন

×