ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে বাড়ছে মাদক কারবার

রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে বাড়ছে মাদক কারবার
×

গিয়াস উদ্দিন টিক্কা, ধুনট (বগুড়া)   

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৫৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

বগুড়ার ধুনটে মামলা, জেল ও জরিমানা করেও থামানো যাচ্ছে না মাদকের রমরমা কারবার। ধুনট পৌর এলাকাসহ উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের অন্তত ১৮০টি পয়েন্টে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা, হিরোইন, ট্যাপেন্টাডল, আইস, ফেনসিডিল ও গাঁজাসহ নানা ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য। টেকনাফ ও উত্তরাঞ্চলের সীমান্ত এলাকা থেকে আসা এসব চালানের একটি অংশ স্থানীয়ভাবে বিক্রির পাশাপাশি নদীপথে ছড়িয়ে পড়ছে ঢাকা, জামালপুর, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

চোরাই পথ ও ট্রানজিট পয়েন্ট
অনুসন্ধানে জানা যায়, জয়পুরহাটের পাঁচবিবি সীমান্ত দিয়ে হিরোইন, ফেনসিডিল, ট্যাপেন্টাডল ও গাঁজার চালান ধুনটে প্রবেশ করে। এ ছাড়া টেকনাফ থেকে আসা ইয়াবা এবং উত্তরাঞ্চলের সীমান্ত দিয়ে আসা বিভিন্ন মাদক মথুরাপুর ও গোপালনগর ইউনিয়নকে প্রধান ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করে সরবরাহ করা হচ্ছে। যমুনা নদীর শহরাবাড়ি ঘাট দিয়ে এসব মাদক দেশের বিভিন্ন স্থানে পাচার হচ্ছে; আবার একই রুট দিয়ে জামালপুর ও কাজিপুরের চরাঞ্চল থেকে আসছে গাঁজার বড় বড় চালান।
টেকনাফ থেকে আসা নারী পাচারকারীরা ভিক্ষুক বা ভদ্রবেশী ছদ্মবেশে প্রতি সপ্তাহে পাঁচ থেকে ছয় লাখ পিস ইয়াবার চালান স্থানীয় কারবারীদের কাছে পৌঁছে দেয়। প্রতি চালানে ৫০ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পান তারা, আর ধরা পড়লে নেপথ্যের ‘বড় ভাই’ আইনি খরচ বহন করেন।

সন্তানের সুরক্ষা নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা
ঘরে ঘরে মাদক পৌঁছে যাওয়ায় ভেঙে পড়েছে সামাজিক শৃঙ্খলা। মথুরাপুরের হেদায়েতুল ইসলাম, প্রতাপ খাদুলীর গোলাম মোস্তফাসহ একাধিক অভিভাবক জানান, নেশার টাকার জন্য সন্তানরা বাবা-মাকে খুন করতে আসে। এমনকি নিরুপায় হয়ে চিকাশী গ্রাম ও পশ্চিম ভরন শাহীর গ্রামের দুজন অভিভাবক নিজেদের সন্তানকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন। মথুরাপুর ইউনিয়নের হিজুলী গ্রামের ‘প্রটেকশন ফর লিগ্যাল অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন’-এর সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম জানান, তাঁর পরিবারের সদস্যরাও এ আশঙ্কায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

মথুরাপুর ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের, চৌকিবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাসানুল করিম পুটু এবং গোপালনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে এলাকার উঠতি বয়সী যুবসমাজ ধ্বংসের মুখে। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা সভায় একাধিকবার অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার মেলেনি।
বাংলাদেশ মানবাধিকার সংস্থার সদস্য মোহাম্মদ আলী দাবি করেন, শুধু মথুরাপুর ইউনিয়াতেই অন্তত দেড় হাজার ব্যক্তি মাদক বেচাকেনায় সক্রিয়।

রাজনৈতিক আশ্রয়ের অভিযোগ
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কারবারিরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেছেন। মথুরাপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে সহযোগিতার অভিযোগ উঠলেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন। এ ছাড়া মাদকে সম্পৃক্ততার অভিযোগে আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি সংসদের ধুনট উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম ও এলাঙ্গী 
ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক উজ্জ্বল মিয়াকে আগেই বহিষ্কার করা হয়েছে। গত ২৮ জুন ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জহুরুল ইসলামের ইয়াবা সেবনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সব ইউনিয়ন যুবদলের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে কথা বলতে জাহিদুল ইসলাম ও উজ্জ্বল মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তারা দুজনই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের ভাষ্য, প্রতিপক্ষরা রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করতে এমন অভিযোগ করেছেন। ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মাদক মামলার আসামি হয়েছেন বলে দাবি উজ্জ্বল মিয়ার।
অভিযোগ রয়েছে– বেল্লাল হোসেন, আলী আকবর, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা রাসেল, রাসেলা, রফিকুল, সেতু, দুলাল, আমিনুল, রুপালী, রফিক, বাদশা মিয়া, সেলিম ও উজ্জ্বল মিয়াসহ অনেকে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন।

জেলা গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, রাজনৈতিক আশ্রয় থাকার কারণে স্থানীয় থানা পুলিশ অনেক সময় আসামি ধরতে হিমশিম খায়। তবে ধুনট উপজেলা বিএনপির সভাপতি তৌহিদুল আলম বলেন, ‘মাদকের বিষয়ে কোনো ছাড় নেই। দলীয় কেউ জড়িত থাকলে পুলিশকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।’
উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ সূত্রের তথ্যমতে, গত ৬ মাসে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ২৮ জনকে জেল-জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ অভিযান চালিয়ে ৬১ জনকে আটক, ৫৪৪ পিস ইয়াবা, ৩১৭ পিস ট্যাপেন্টাডল, ১৮.৫ কেজি গাঁজা ও ১২ গ্রাম হিরোইন উদ্ধারসহ ৩২টি মামলা দায়ের করেছে।
ধুনট থানার ওসি আতিকুল ইসলাম জানান, ‘জনবল সংকটের কারণে বিস্তৃত চরাঞ্চল ও প্রান্তিক এলাকায় অভিযান চালানো কঠিন হয়। পুলিশ দেখলেই তারা গা ঢাকা দেয়। এ ছাড়া সাক্ষীর অভাবে জামিনে বেরিয়ে এসে তারা আবার পুরোনো কারবারে জড়িয়ে পড়ে।’
ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ উল্লাহ নিজামী বলেন, ‘দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি সহকারী কমিশনার (ভূমি)-সহ নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে মাদক কারবারিদের জেল-জরিমানা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

আরও পড়ুন

×