ভূমধ্যসাগরে মৃত্যু, উৎকণ্ঠায় স্বজনরা
সাগরপথে লিবিয়া থেকে গ্রিস
ফাইল ফটো
পঙ্কজ দে, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪৩ | আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
হৃদয় পালের বয়স সবে ১৮। এ বছরই এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু অভাব-অনটনের পরিবার। মুখে ঠিকমতো খাবার জুটতো না। তাই পরিবারে সচ্ছলতা আনার স্বপ্ন দেখেছিলেন। পড়াশোনা ছেড়ে ইউরোপে যেতে চেয়েছিলেন। অবশ্য পথটা ছিল বিপজ্জনক। এই পথ পাড়ি দিতে গিয়ে এখন তাঁর হদিস নেই। তাঁর মা-বাবা সন্তানের খোঁজ পেতে আকুতি-মিনতি করছেন। প্রায় সারাক্ষণই কান্নাকাটি করছেন।
শুধু হৃদয় নন, সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার আরও পাঁচজন একইভাবে নিখোঁজ। প্রত্যেকের খোঁজ পেতে মরিয়া স্বজনরা। সন্তান জীবিত কিনা, কোনো কিছুই তারা জানেন না। ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় কোনো বিপদের শিকার হয়েছেন কিনা, তারও সঠিক উত্তর নেই। তাদের সামনে এখন শুধুই অপেক্ষার প্রহর।
হৃদয় পাল শান্তিগঞ্জের পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের শত্রুমর্দন গ্রামের পালপাড়ার বাসিন্দা। এ বছর পাগলা সরকারি মডেল হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা তাঁর। কিন্তু ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নে পড়াশোনা থামিয়ে কয়েক মাস আগে বাড়ি ছাড়েন তিনি। এরপর কয়েকটি দেশ হয়ে পৌঁছান লিবিয়ায়। সেখান থেকে গ্রিস যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু এখন কোনো খোঁজ মিলছে না।
হৃদয়ের বাবা রন্টু চন্দ্র পাল ক্ষুদ্র ব্যবসা করেন। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রায় ১৫ দিন ছেলের সঙ্গে মোবাইল ফোনে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল তাঁর। ছেলেকে বারবার সতর্ক করতেন যেন কারও সঙ্গে ঝগড়া বা মনোমালিন্যে না জড়ান। গ্রিস যেতে গত ১ আগস্ট কথিত ‘গেম’ হওয়ার কথা তাঁর। অবৈধ বা লুকোচুরি পথে সীমান্ত পার হওয়ার বিপজ্জনক প্রক্রিয়াকে দালালদের ভাষায় গেম বলে। সেই যাত্রা শেষ পর্যন্ত হয়েছিল কিনা, সেটিও জানার উপায় নেই তার। কারণ ওই সময়ের পর থেকে হৃদয়ের সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
সরেজমিন হৃদয়দের বাড়িতে তাঁর বাবা রন্টু পালের সঙ্গে কথা হয়। ছেলের বিষয়ে জিজ্ঞেস করতেই অঝোরে কাঁদতে শুরু করেন। একপর্যায়ে চিৎকার দিয়ে শুধু বললেন, ‘না, আমি কিছুই বলতে পারব না।’
হৃদয়ের সঙ্গে তাঁর বাড়ির পাশের পাথারিয়া ইউনিয়নের শ্যামনগর গ্রামের তিনজন, জয়কলস ইউনিয়নের ডুংরিয়া গ্রামের একজন এবং পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের রনসী গ্রামের একজনও লিবিয়া যান। সেখান থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে তাদের সঙ্গে আরও কয়েকজনের যুক্ত হওয়ার কথা ছিল। এরই মধ্যে তাদের কেউ কেউ গ্রিস পৌঁছেছেন বলে পরিবারে খবর এসেছে। কিন্তু হৃদয়ের কোনো খবর আসেনি।
শান্তিগঞ্জের ডুংরিয়া গ্রামের ২৮ বছর বয়সী সোহেল মিয়া। তিনি ইছন মিয়ার ছেলে। পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় সোহেল। হতদরিদ্র পরিবারের সংকট দূর করতে তিনিও পাড়ি জমিয়েছিলেন। লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার কথা থাকলেও তাঁরও কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।
নিখোঁজদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ছয়জনের প্রত্যেকেই ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে লিবিয়ায় গিয়েছিলেন। পরিবারের সদস্যদের দাবি, মানব পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে তাদের সন্তানরা বিদেশে পাড়ি জমান। তবে ঠিক কার মাধ্যমে কে লিবিয়ায় গেছেন, সে বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের অনেকেই এখনও বিস্তারিত বলতে রাজি নন। তাদের ভাষ্য, আগে বিষয়টি ভালোভাবে বুঝে ও নিশ্চিত হয়ে পরে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন।
তবে স্থানীয় অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডুংরিয়া গ্রামের সোহেল মিয়া ও পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের হৃদয় পালকে লিবিয়ায় পাঠানোর সঙ্গে একই গ্রামের কুদ্দুস মিয়ার সম্পৃক্ততার অভিযোগ আছে। কুদ্দুস মিয়া তাদের লিবিয়ায় পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে। তবে তিনি সরাসরি কথা বলতে রাজি হননি।
সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বললেন, ডিএসবি ও শান্তিগঞ্জ থানার পুলিশকে খোঁজ-খবর নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীদের তরফ থেকে অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে মামলা হবে।
নৌকায় করে লিবিয়া হয়ে গ্রিসে যাওয়ার পথে সম্প্রতি ভূমধ্যসাগরে ১১ দিন ভেসে থাকার পর ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও গরমে ১১ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে অন্তত ৯ জন বাংলাদেশি। ওই নৌকার বেঁচে যাওয়া যাত্রী সুনামগঞ্জের আবদুল করিমের বরাতে মিসরের কায়রোতে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি (শ্রম) মো. জাকির হোসেন সংবাদমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
আবদুল করিম দূতাবাসকে জানিয়েছেন, ৩ আগস্ট ৪২ যাত্রী নিয়ে একটি রাবারের নৌকা লিবিয়া থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয়। বোটটির ধারণক্ষমতা ছিল ২৫ জন। ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকায় থাকা খাবার ও পানি সাগরে ভেসে যায় এবং এক পর্যায়ে নৌকার জ্বালানি ফুরিয়ে যায়। টানা ১১ দিন খাবার ও পানি ছাড়া ভেসে থাকার পর ১৩ আগস্ট নৌকাটি মিসরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছালে স্থানীয় পুলিশ তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। যাত্রীদের মধ্যে ৩৮ জন বাংলাদেশি ও চারজন সুদানের নাগরিক ছিলেন।
- বিষয় :
- ভূমধ্যসাগর
- লিবিয়া
- গ্রিস