প্রকল্পে গলদ, বৃষ্টিতে ডোবে বন্দরনগরী
চট্টগ্রামে রোববার রাত থেকে টানা ভারী বৃষ্টিতে অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নগরীর আগ্রাবাদ বেপারীপাড় গুলবাগ আবাসিক এলাকায় ভবনের নিচতলায় পানিতে ভাসছে রান্নাঘরের জিনিসপত্র। গতকাল সোমবার সকালে তোলা -মো. রাশেদ
চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৫০ | আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ১০:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রকল্পের শুরুতে গলদ থাকায় তিন সরকারি সংস্থা ১০ হাজার কোটি টাকা খরচ করার পরও সামান্য বৃষ্টিতেই ডুবে যায় চট্টগ্রাম নগরী। চার প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে থাকলেও গত তিন মাসে বন্দরনগরী তিন দফা পানিতে ডুবেছে। এতে অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। গতকাল সোমবারও বৃহত্তম পাইকারি মোকাম রেয়াজুদ্দিন বাজারে শতাধিক দোকানের মালপত্র তলিয়ে গেছে পানিতে।
নগরবাসীকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), সিটি করপোরেশন (চসিক) ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ১৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরুতে গলদ রেখে এসব প্রকল্প গৃহীত হওয়ায় এরই মধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও খেসারত গুনছে ৭০ লাখ নগরবাসী।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান বলেন, যথাযথভাবে সমীক্ষা না করা, পানিপ্রবাহ বিশ্লেষণ না করা, জোয়ার-ভাটা বিবেচনায় না আনা, খাল-নালা-জলাধারের সক্ষমতা বুঝতে না পারা ও অপরিকল্পিতভাবে স্লুইসগেট নির্মাণের কারণে প্রকল্পের শেষ পর্যায়ে এসেও মিলছে না সুফল। ১৯৯৫ সালের ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রস্তাবও উপেক্ষা করা হয়েছে এসব প্রকল্প গ্রহণে। এ জন্য সামান্য বৃষ্টিতেও হাঁটুপানি জমে যাচ্ছে নগরের নিম্নাঞ্চলে।
চলতি মৌসুমে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে চকবাজার, আগ্রাবাদ, কাতালগঞ্জ, মুরাদপুর, জিইসি, বহদ্দারহাট, হালিশহর, জামালখান, নিউমার্কেট, তিন পুলের মাথাসহ ২০টি এলাকা পানির নিচে চলে যায়। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমর সমান, আবার কোথাও বুকপানি জমে। গতকাল সোমবারও ছিল এমন চিত্র। গত রোববার সকাল ৬টা থেকে ৯টার পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় ১০৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এতেই বিভিন্ন নিচু এলাকা ও সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। ডুবে যায় রেললাইনও। এতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেন। চরম ভোগান্তিতে পড়েন শিক্ষার্থীরা।
জলাবদ্ধতা নিরসনে চারটি প্রকল্পে মোট ব্যয় হচ্ছে ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। গত জুন পর্যন্ত এসব প্রকল্পে খরচ হয়েছে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু কোনো প্রকল্পের কাজই শতভাগ শেষ হয়নি। সবচেয়ে বড় প্রকল্প সিডিএর ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনর্খনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’-এর কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। ২০১৭ সালে অনুমোদিত এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। কাগজে-কলমে প্রকল্পের অগ্রগতি প্রায় ৯৫ শতাংশ। তারপরও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছে নগরবাসী।
সিডিএর চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘প্রকল্পে যে ৩৬টি খাল নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে ৩০টির কাজ শেষ হয়েছে। বাকি খালগুলোর বেশির ভাগের কাজ শেষ পর্যায়ে। তবে হিজড়া খাল ও জামালখান খালের কাজ এখনও চলমান। এসব খালে কাজের জন্য অস্থায়ী বাঁধ দেওয়া হয়েছিল। চলতি মৌসুমে বারবার ভারী বৃষ্টি হওয়ায় পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আগামী বছর সুফল পাবেন নগরবাসী।’
প্রকল্পের বাইরে ৩৮ খাল
জলাবদ্ধতা নিরসনে চারটি প্রকল্প চলমান থাকলেও নগরের সব খাল নেই এসব উদ্যোগে। সিডিএ বলছে, নগরে ছোট-বড় ৭৪টি খাল আছে। এর মধ্যে ৬১টি খাল নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু বড় প্রকল্পে নেওয়া হয়েছে মাত্র ৩৬টি খাল, অর্থাৎ বাকি ৩৮টি খাল এখনও প্রকল্পের বাইরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব খাল বাইরে রেখে প্রকল্পের পুরো সুফল নগরবাসী পাবে না।
উপেক্ষিত মাস্টারপ্ল্যান
১৯৯৫ সালে প্রণীত ‘চিটাগং স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজ অ্যান্ড ফ্লাড কন্ট্রোল মাস্টারপ্ল্যান’ বা ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনায় জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য যে সুপারিশ ছিল, তার অনেক কিছুই বর্তমান প্রকল্পে উপেক্ষিত রয়েছে। সেই মহাপরিকল্পনায় তিনটি নতুন মূল খাল ও ১৫টি নতুন শাখা খাল খননের প্রস্তাব ছিল। বিদ্যমান মূল ও শাখা খাল সংস্কার, দখলমুক্ত করা, কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত খালের মুখে ৩৬টি টাইডাল রেগুলেটর স্থাপন, পাহাড়ি বালু ঠেকাতে ১৯টি সিল্ট ট্র্যাপ নির্মাণ এবং বৃষ্টি বা জোয়ারের পানি ধারণে আটটি জলাধার সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান প্রকল্পে জলাধার সংরক্ষণের বিষয়টি কার্যত বাদ পড়েছে। এতে অতিরিক্ত পানি ধরে রাখার সুযোগ কমে গেছে।
দুর্ভোগ যেন নিয়তি
গতকাল সকালে ভারি বৃষ্টিপাতে রেললাইন ডুবে যাওয়ায় নগরীর বটতলী স্টেশন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া দুটি শাটল ট্রেন ষোলশহর স্টেশন এলাকায় আটকা পড়ে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রেললাইন থেকে পানি নেমে যাওয়ায় পুনরায় শাটল ট্রেন চলাচল শুরু হয়। সকাল ৭টা ১৫ মিনিট ও ৭টা ৪০ মিনিটে দুটি ট্রেন বটতলী স্টেশন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। কিন্তু ষোলশহর ও ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনের মাঝামাঝি এলাকায় বৃষ্টির পানি জমে রেললাইন ডুবে গেলে ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় এগোতে পারেনি ট্রেন দুটি। আইন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ইমানুর রহমান বলেন, ‘সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের শাটল ট্রেনে ক্লাসের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলাম। ষোলশহরে আসার পর ট্রেনটি আর চলেনি। পরে জানতে পারি, অক্সিজেন এলাকায় পানি জমে যাওয়ায় চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।’
ফের ডুবেছে রেয়াজুদ্দিন বাজার
গতকাল সকালে তিন ঘণ্টার বৃষ্টিতে স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধতা হয়েছে চট্টগ্রামের বৃহৎ পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্যকেন্দ্র রেয়াজুদ্দিন বাজারে। রেয়াজুদ্দিন বাজার ও তামাকুমণ্ডি লেনের প্রায় ১৩০টি মার্কেটের নিচতলার ৮০০ দোকান পানিতে ডুবেছে। এতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকার। খুব সকালে দোকান ও গুদামে পানি ঢুকে পড়ায় পণ্য সামলানোর সময় পাননি ব্যবসায়ীরা।
রেয়াজুদ্দিন বাজারের রফিক উদ্দিন সিদ্দিকী সড়কে শাড়ির দোকান রূপরাজ। গতকাল সকালের বৃষ্টিতে হাঁটুপানিতে ডুবে যায় নিচতলার দোকানটি। সাজিয়ে রাখা শাড়ির অর্ধেক ডুবে যায় পানিতে। দুপুর ১২টার দিকে মালিক মাহমুদুল হক ও কর্মচারীরা দোকানটি পানিমুক্ত করার চেষ্টা করছিলেন। মাহমুদুল হক জানালেন, তাঁর দোকানে প্রায় অর্ধকোটি টাকার কাপড় রয়েছে। এর মধ্যে ১০-১২ লাখ টাকার কাপড় নষ্ট হয়ে গেছে।
সকাল ৮টার দিকে পানিতে ভাসছিল বাহার লেনের হক সন্সের শত শত জুতা। পানি এত দ্রুত এসেছে যে নিচতলার দোকানের বেশিরভাগ জুতা পানিতে ভেসে যায়। দোকানের মালিক জিয়াউল হাকিম বললেন, ‘সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছিল। তাই আজ একটু আগেভাগে দোকানে এসেছি। দোকান খুলে দেখি জুতাগুলো পানিতে ভাসছে। আমার প্রায় আট লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।’