ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অনৈতিক সুবিধায় ‘ভৌতিক’ চালকলে সরকারি বরাদ্দ

অনৈতিক সুবিধায় ‘ভৌতিক’ চালকলে সরকারি বরাদ্দ
×

আমিনুল ইসলাম খান রানা, সিরাজগঞ্জ

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২০

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাঙ্গণজুড়ে ঝোপঝাড় ও আগাছা। মরিচা ধরা বয়লার পড়ে আছে। এক যুগ বা তারও বেশি সময় ধরে যেখানে এক দানা ধানও ছাঁটাই হয়নি; কাগজ-কলমে সেই বন্ধ কিংবা অস্তিত্বহীন চালকলের নামেই নেওয়া হচ্ছে সরকারি বরাদ্দ। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে খাদ্য বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রভাবশালী মিল মালিকদের যোগসাজশে এমন ‘ভৌতিক’ কারবার চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, একই চাতাল দেখিয়ে একাধিক লাইসেন্স নেওয়া হচ্ছে। বাস্তবে উৎপাদন না থাকলেও এসব লাইসেন্সের বিপরীতে বছরের পর বছর সরকারি ধান-চাল সংগ্রহের বরাদ্দ নিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কয়েকটি মিলে তুষের বদলে প্লাস্টিক, পলিথিন, গার্মেন্টসের ঝুট ও কাপড়ের বর্জ্য পোড়ানোর অভিযোগও রয়েছে।

অচল মিলে সরকারি বরাদ্দ
সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় নিবন্ধিত ১৪২টি চালকলের মধ্যে ১৩৭টির জন্য প্রায় ১২ হাজার টন সেদ্ধ চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রতি টন ৪৯ হাজার টাকা হিসেবে মোট বরাদ্দের সরকারি মূল্য দাঁড়িয়েছে ৫৮ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৬০ থেকে ৭০টিরই বর্তমানে কোনো অস্তিত্ব নেই। 
চান্দাইকোনার ‘লুৎফা’ ও ‘ওমর’ সেমি অটো মিল প্রায় এক যুগ ধরে বন্ধ। অথচ একই চাতালে বাবা-ছেলের নামে চারটি লাইসেন্স ব্যবহার করে চলতি মৌসুমে ১৪৭ টন চালের বরাদ্দ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। একইভাবে চালকল মালিক সমিতির নেতা এস এম সাগর সরকারের অচল মিল থাকা সত্ত্বেও তাঁর অনৈতিক প্রভাবে ‘আনোয়ারা’ ও ‘সারা’ মিলের নামে ১৬৪ টন, ‘মামা-ভাগনে’ মিলে ২০৯ টন, কাগজপত্রে থাকা ভুয়া ‘খাজা’ মিলে ১৯১ টন এবং বিগত ১৫ বছর ধরে বন্ধ ‘আকন্দ’ সেমি অটো মিলে ৬২ টন চালের বরাদ্দ দেওয়া হয়। 
উপজেলা চালকল মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল মোতালেব শেখ জানান, তাঁর চারটি মিলের মধ্যে বন্ধ থাকা একটি চালু করা হয়েছে। ব্যবসায় ছোটখাটো সমস্যা থাকতেই পারে। তিনি অভিযোগকারী সোহাগের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তর ও সাংবাদিকদের কাছে ভিত্তিহীন তথ্য দেওয়ার অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, সোহাগ মিল মালিকদের কাছে ৬৮ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছেন। এ ঘটনায় রায়গঞ্জ থানায় মামলা এবং মানববন্ধন হয়েছে।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. হারুন অর রশিদ বলেন, লাইসেন্সগুলো ১৪-১৫ বছর আগের। উপজেলা পর্যায়ের কমিটির সরেজমিন তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই চাল সরবরাহের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, সরেজমিন মিলগুলো সচল পেয়েছেন। তবে অভিযোগ পাওয়ার পর জেলা প্রশাসকের নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি প্রয়োজনীয় নথিপত্র না থাকা, চালকল ও চাতাল অচল থাকা এবং সার্বিক অনিয়মের সত্যতা পেয়ে ৫টি চালকলের ৪০০ টন চালের বরাদ্দ বাতিল করেছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
একই চাতালে একাধিক লাইসেন্স
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একই স্থানে একাধিক ধান ছাঁটাই মিল স্থাপন করলে প্রতিটির পৃথক লাইসেন্স ও আলাদা পাক্ষিক রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। তবে রায়গঞ্জে কোনো রিটার্ন বা উৎপাদন ছাড়াই একই চাতালে তিন-চারটি লাইসেন্স ঝুলছে বলে অভিযোগ।

চান্দাইকোনা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক সহসভাপতি এস এম সোহাগ খাদ্য ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে দেওয়া লিখিত অভিযোগে বলেন, রায়গঞ্জে বহু অবৈধ রাইস মিল রয়েছে। অধিকাংশের বৈধ লাইসেন্স ও পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। একই চাতাল দেখিয়ে একাধিক লাইসেন্সের মাধ্যমে সরকারি বরাদ্দ নেওয়া এবং প্লাস্টিক-পলিথিন পুড়িয়ে পরিবেশ ধ্বংস করা হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, কতিপয় কর্মকর্তার মদদে এসব অনিয়ম চলায় রাষ্ট্র বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে।
অভিযোগকারীর একই প্রশ্ন স্থানীয় সচেতন মহলেরও। তাদের অভিযোগ, অচল মিলের নামে বরাদ্দ, একই চাতালে একাধিক লাইসেন্স ও পরিবেশগত অনিয়ম থাকলে বরাদ্দের আগে সরকারি মনিটরিংয়ে তা ধরা পড়ল না কেন। তাদের দাবি, কোন মিল থেকে বরাদ্দের চাল উৎপাদন ও 
সরবরাহ হয়েছে এবং সরকারি অর্থের ক্ষতি কতটা হয়েছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তে বের করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
রায়গঞ্জ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, যোগদানের সময় ১৭০টি মিল ছিল। অভিযোগের পর তদন্ত করে ২৫-৩০টির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।

বিষাক্ত ধোঁয়ায় অতিষ্ঠ জনজীবন
স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েকটি চালকলের বয়লার ও চুল্লিতে তুষের পরিবর্তে প্লাস্টিক, পলিথিন, গার্মেন্টসের ঝুট ও কাপড়ের বর্জ্য পোড়ানো হচ্ছে। এতে কালো ধোঁয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত। শিশু ও বয়স্কদের শ্বাসকষ্টসহ নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলে জানান বাসিন্দারা। গাছে ফলনও কমে যাচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ।
বাংলাদেশ পরিবেশবাদী আন্দোলন-বাপার সিরাজগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক সাংবাদিক দীপক কুমার কর বলেন, রায়গঞ্জে কাগজ-কলমে ১৪২টি চালকল থাকলেও প্রায় ৬০টির বিরুদ্ধে নানা বিতর্ক রয়েছে। অনেক মিলের সামনেই সাইনবোর্ড নেই। তুষের পরিবর্তে গার্মেন্টসের ঝুট ও প্লাস্টিকের বর্জ্য পোড়ানো হচ্ছে। এতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। তিনি জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।
সিরাজগঞ্জের পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক তুহিন আলম বলেন, যেসব মিলের পরিবেশ ছাড়পত্র নেই বা তুষের বদলে পলিথিন ও গার্মেন্টসের বর্জ্য ব্যবহার করে; তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রায়গঞ্জের ইউএনও আব্দুল খালেক পাটোয়ারী বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে উপজেলা সমবায় ও বিএডিসির কর্মকর্তা রয়েছেন। ১২ জুলাইয়ের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার কথা থাকলেও তদন্তের সময় বাড়ানোর আবেদন করা হবে বলে জানান কমিটির প্রধান ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মমিনুল ইসলাম।
সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. আইনুল হকের বক্তব্য জানতে ফোন ও মেসেজ পাঠানো হলেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।
 

আরও পড়ুন

×