ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বছর না যেতেই কোটি টাকার সড়ক এখন ভূতুড়ে জঙ্গল

বছর না যেতেই কোটি টাকার সড়ক এখন ভূতুড়ে জঙ্গল
×

ঘন জঙ্গলে ঢেকে গেছে পাবনার বেড়া উপজেলার বড়শিলা-নলভাঙা-খাকছাড়া সড়ক সমকাল

সাঁথিয়া (পাবনা) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

সুনসান চারপাশ, নিস্তব্ধ পথ। দিনের বেলায়ও হেঁটে যেতে গা ছমছম করে। পিচ উঠে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত, চারপাশে ঘন আগাছা ও ছোট ছোট গাছপালা। যে পথ দিয়ে এক সময় প্রতিদিন শত শত যানবাহন ও ১০টি গ্রামের মানুষ যাতায়াত করত, অবহেলা আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেটি এখন ভূতুড়ে এক জঙ্গলে রূপ নিয়েছে। মানুষের চলাচল দূরের কথা, সেখানে দিনে-দুপুরে বেরিয়ে আসে শিয়াল ও বিষধর সাপ।
পাবনার বেড়া উপজেলার বড়শিলা-নলভাঙা-খাকছাড়া সড়কের করুণ এই দশা এলাকার মানুষের জীবনযাত্রাকে স্থবির করে দিয়েছে। অথচ সড়কটি নির্মাণের পর উপজেলার অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের যাতায়াতে মুখর থাকত। কিন্তু নির্মাণের ১৩ বছর পর সেই ব্যস্ত সড়ক এখন ভেঙেচুরে একাকার। এই পথে এখন কেউ চলাচল করে না। বেহাল সড়কের কারণে বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের ১০ কিলোমিটার পথ ঘুরে সদরে যেতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ দুটোরই অপচয় হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্র জানায়, বিল এলাকার সুবিধার্থে ২০১৩ সালে এক কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে বেড়া পৌরসভার বড়শিলা থেকে চাকলা ইউনিয়নের খাকছাড়া পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল। চালুর পর উপজেলার নলভাঙা, খাকছাড়া, ডমডমা, জয়নগর, কৈতলাসহ ১০টি গ্রামের কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষার্থী ও চিকিৎসাসেবার জন্য রোগীরা চলাচল করত।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিল এলাকার প্রাকৃতিক গঠন বিবেচনা না করে নিচু ও সরু করে সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ফলে প্রথম বর্ষাতেই এটি ক্ষয়ে যেতে থাকে। পরে সময়ে নিয়মিত কোনো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ না করায় সড়কটি পুরোপুরিভাবে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। বর্তমানে সেখানে ঘন ঝোপজঙ্গল। সাপ, শিয়াল বেজিসহ বিষাক্ত পোকামাকড়ের বসবাস সেখানে। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোনো যানবাহনের দেখা মেলেনি, সন্ধ্যার পর নিরাপত্তার শঙ্কায় এই পথে কেউ পা বাড়ান না। স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবির মুখে ২০২২ সালে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটি পুনর্নির্মাণের জন্য এলজিইডি একটি প্রকল্প পাঠালেও অর্থ বরাদ্দের অভাবে তা অনুমোদন পায়নি।
নলভাঙা গ্রামের কৃষক নাজিম উদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এক সময় এই রাস্তা দিয়ে সহজে উপজেলা সদরে যেতাম। এখন দিনের বেলাতেও হাঁটতে ভয় লাগে। বাধ্য হয়ে ১০ কিলোমিটার পথ ঘুরে সদরে যেতে হচ্ছে। কর্তাদের অপরিকল্পিত পরিকল্পনার কারণে সরকারের মোটা অঙ্কের টাকা পানিতে ফেলা হয়।’
ভ্যানচালক মকবুল হোসেন জানান, মালপত্র পরিবহন তো বন্ধই, রাতে কোনো জরুরি রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। জরুরি প্রয়োজনে হেটেও এ পথ মাড়ানোর চিন্তা করতে পারেন না স্থানীয়রা।

খাকছাড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মানিক হোসেন এ প্রতিবেদককে জানান, সড়কটি চালু হওয়ার পর আশপাশের গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল। এখন নষ্ট হওয়ায় চারপাশের একাধিক গ্রামের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে আসা বন্ধ হয়ে গেছে। এক সময়ের ব্যস্ত সড়কটি এখন জনশূন্য।
বিষয়টি স্বীকার করে এলজিইডির বেড়া উপজেলা কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী রমজানুল ইসলাম জানান, বড়শিলা-নলভাঙা সড়কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কয়েক বছর আগে সংস্কারের জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। এরপরও প্রকল্পটি পাস হয়নি। তবে শিগগিরই নতুন করে একটি প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।
পাবনা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুল ইসলাম বলেন, সড়কটির জন্য অতীতে পাঠানো প্রকল্পটি অনুমোদন না পাওয়ায় কাজ আটকে গিয়েছিল। সম্প্রতি সরকার ‘পাবনা প্রকল্প’ নামে ১০ কোটি টাকার একটি মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর আওতায় পুনর্নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাব অনুমোদন হলেই কাজ শুরু করা হবে।

আরও পড়ুন

×