ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফোনে পুলিশ সেজে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়

ফোনে পুলিশ সেজে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়
×

সনি আজাদ, চারঘাট (রাজশাহী)

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:১০

| প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যবসায়ী মো. মনিরুজ্জামানের মোবাইল ফোন নম্বরে গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে অচেনা নম্বরের একটি কল আসে। তিনি কলটি রিসিভ করতেই এক ব্যক্তি নিজেকে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) পরিচয় দিয়ে জানান, তাঁর কিশোর ছেলেকে মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আটক করা হয়েছে। বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির জন্য মনিরুজ্জামানকে সন্তানের কান্নার শব্দও শোনানো হয়। ছেলেকে ছাড়াতে হলে ৪০ হাজার টাকা দাবি করেন ওই ব্যক্তি। ঘটনার আকস্মিকতায় ঘাবড়ে যান তিনি। পরে ২০ হাজার টাকাও পাঠান রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার আশকরপুর এলাকায় বাসিন্দা মনিরুজ্জামান।
দাবি করা টাকার অর্ধেক পেয়েও থামেনি চক্রটি। সাংবাদিকদের দেওয়ার নাম করে মনিরুজ্জামানের কাছে তারা আরও ২০ হাজার টাকা দাবি করে। তখন এই ব্যবসায়ী আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে কথা বলেন। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, তাঁর দশম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে নিজ বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেই আছে। তখনই বুঝতে পারেন, প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়েছেন তিনি। এ বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার চারঘাট থানায় লিখিত অভিযোগ দেন।

অভিনব এই কৌশলে চারঘাটে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের টার্গেট করে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। সাম্প্রতিক সময়ে এমন একাধিক ঘটনায় উপজেলার শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, উপজেলা সদরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক ও বিত্তশালী ব্যক্তিদের বাছাই করে ফোনকল করছে চক্রটি। এক মাসে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীর অভিভাবকের কাছে এভাবে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে তারা।

বেশির ভাগ ঘটনায় ‘আপনার সন্তান মাদকদ্রব্যসহ আমাদের হাতে ধরা পড়েছে’ বলে ফোনের ওপাশ থেকে কথা বলে চক্রের সদস্যরা। তারা পুলিশ বা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে মামলা, আদালত ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়ার ভয় দেখায় অভিভাবকদের। এমন কথা শুনেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন অভিভাবকরা। পরে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির জন্য শোনানো হয় পুলিশের ওয়্যারলেস ও গাড়ির সাইরেনের শব্দ। কখনও আবার সন্তানের কান্নার মতো কণ্ঠ শোনানো হচ্ছে। এক পর্যায়ে মামলা থেকে সন্তানকে বাঁচাতে বিকাশ বা নগদে দ্রুত টাকা পাঠানোর চাপ দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী কয়েকজনের দেওয়া তথ্যমতে, প্রতারকরা ফোনে কল দিয়ে অভিভাবককে সন্তানের নাম, শ্রেণি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামও বলে। ফলে অনেকেই প্রথমে বিষয়টি সত্য বলে ধরে নেন। পরে বিকাশ বা নগদে টাকা পাঠানোর পর খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, সন্তান বাড়িতে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদেই রয়েছে।

পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা
গত ২৪ আগস্ট দুপুরে উপজেলার পিরোজপুর (১) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুরাদ আলীর ফোনে একটি কল আসে। তাঁকেও জানানো হয়, কিশোর ছেলেকে মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আটক করা হয়েছে। এরপর সন্তানের কণ্ঠ নকল করে কান্নার আওয়াজ শোনানো হয়। মামলা থেকে ছেলেকে বাঁচাতে দ্রুত ৩০ হাজার টাকা পাঠাতে বলা হয় তাঁকে।
মুরাদ আলী বলেন, ‘আমার ছেলে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আটক হয়েছে বলার পর ওয়্যারলেস ও পুলিশের গাড়ির সাইরেনের শব্দ শুনে আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই। তারা বলে, কারও সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করলে ছেলের ক্ষতি হবে। ফোন না কাটতেও বলা হয়। ভয়ে বাড়ি থেকে টাকা এনে তাদের দেওয়া নম্বরে ৩০ হাজার টাকা পাঠাই। পরে বাসায় গিয়ে দেখি ছেলে ঘুমাচ্ছে।’ এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগও করেন মুরাদ আলী। তবে তাঁর অভিযোগ, ১০ দিন পার হলেও পুলিশ এখন পর্যন্ত কোনো রকম যোগাযোগই করেনি। 
উপজেলার রাওথা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তপু রায়হানের নম্বরে কল করে একই কায়দায় প্রতারণার চেষ্টা করে চক্রটি। তিনি বাসায় কল করে জানতে পারেন, ছেলে বাসাতেই আছে। এ বিষয়ে তিনি থানায় অভিযোগ করেন।

কায়দা একই
গত ৩০ আগস্ট একই কায়দায় উপজেলার বড়বড়িয়া এলাকার হাবিবুর রহমানের কাছ থেকে ২৪ হাজার টাকা ও ২৭ আগস্ট রায়পুর এলাকার আলতাফ হোসেনের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে প্রতারকেরা।
চারঘাট উপজেলায় এভাবে প্রতারণার শিকার হয়ে মোট কতজন অভিভাবক অর্থ খুইয়েছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই পুলিশের কাছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক মাসে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও বিত্তশালী দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীর অভিভাবকের কাছে কল 
করেছে চক্রটি। এর মধ্যে টাকা দিতে বাধ্য হন অর্ধশতাধিক অভিভাবক।
প্রতারকরা শিক্ষার্থীর নাম, শ্রেণি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য কীভাবে পাচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব ব্যক্তিগত তথ্যের নির্দিষ্ট উৎস এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করছেন, স্থানীয়

প্রশাসনের পক্ষ 
থেকেও এ বিষয়ে তেমন প্রচার বা কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
চারঘাট উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আমাকেও ফোনকল করে একই কায়দায় আমার ছেলের কথা বলে প্রতারণার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন শিক্ষকের কাছে এভাবে কল করা হচ্ছে। অনেক শিক্ষক সম্মানের কথা ভেবে সরল মনে টাকা দিয়ে দিচ্ছেন।’ তিনি জানিয়েছেন, প্রতারকদের ব্যবহৃত নম্বরগুলো সংগ্রহ করে থানায় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি।

চারঘাট মডেল থানার ওসি মাহাবুবুর রহমান বলেন, পুলিশ ও ডিবির পরিচয়ে অভিভাবকদের কল করে টাকা দাবির বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। প্রতারক চক্রকে শনাক্ত করতে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সহায়তা নিচ্ছেন তারা। তবে তিনি এ বিষয়ে অভিভাবকদেরও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।
রাজশাহী জেলা জজকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী রাকিব সরকার বলেন, এ ধরনের প্রতারণার শিকার ব্যক্তি থানায় অভিযোগের পাশাপাশি আদালতেও আশ্রয় নিতে পারেন। থানা মামলা নিতে গড়িমসি করলে বা অভিযোগের পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে নালিশি মামলা করা যায়। আদালত অভিযোগের ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আদেশ দিতে পারেন। তবে দ্রুত প্রতিকার পেতে প্রতারকদের মোবাইল নম্বর, কল রেকর্ড, টাকা পাঠানোর ট্রানজেকশন আইডি ও অন্যান্য প্রমাণ সংরক্ষণ প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

×