২৪ ঘণ্টায় তিস্তায় বিলীন ১০০ ঘর হুমকিতে শতাধিক একর জমি
গত বুধবার বিকেল ৪টার পর থেকে হঠাৎ তিস্তায় তীব্র তাণ্ডব শুরু হয়। বৃহস্পতিবার কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগে মুহূর্তের মধ্যে একে একে বিলীন হয়ে যায় শতাধিক ঘরবাড়ি। সুন্দরগঞ্জের কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভোরের পাখি ও সিংগীজানী গ্রাম থেকে তোলা সমকাল
সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘এখন কোথায় জাইয়া ঠাঁই নিমু! ঘর তোলার শেষ সম্বলটুকুও কেড়ি নিল রাক্ষসী তিস্তা। দুই বছরে ছয়বার নদী ভাঙার পর এই জায়গাত কোনোমতে মাথা গুঁজে আছনু। সেটাও আজ চলি গেল। হ্যামার ঘরে দুঃখ দেখার মতো কেউ নাই। চোখের সামনত ঘর দুইটা নদীত চলি গেল, কিছুই করবার পানু না।’
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে নদী ভাঙনে শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভোরের পাখি চরের সিংগীজানী গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল করিম। ঘরবাড়ি হারিয়ে বাকরুদ্ধ একই গ্রামের আজিভান বেগম ও কোমেরন বেওয়া। তিস্তার হঠাৎ রাক্ষসী রূপ ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তাদের মতো অন্তত ১০০ পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই কেড়ে নিয়েছে। চরের বাসিন্দাদের অভিযোগ– পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নিয়মিত গাফিলতি ও চরম অবহেলার কারণে প্রতিবছর চোখের সামনে একের পর এক গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার বিকেল ৪টার পর থেকে উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ভোরের পাখি ও সিংগীজানী গ্রামে হঠাৎ তিস্তার
তীব্র তাণ্ডব শুরু হয়। কোনো কিছু বুঝে ওঠার
আগে মুহূর্তের মধ্যে একে একে বিলীন হয়ে যেতে থাকে বসতঘর ও ফসলি জমি। এরই মধ্যে চরের অন্তত ১০০টি ঘরবাড়ি নদীতে চলে গেছে। নদী তীরের আরও অন্তত ২০০ বসতঘর ও শতাধিক একর ফসলি জমি ভাঙনের মুখে রয়েছে। এর আগে গত ১৮ আগস্ট এই একই স্থানে তিস্তায় বিলীন হয়েছিল ঐতিহ্যবাহী ‘ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি’।
ভাঙনের খবর পেয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঈফফাত জাহান তুলি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে যান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মশিয়ার রহমান, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ, কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. মঞ্জু মিয়া, উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. মাহমুদুল ইসলাম প্রামাণিক এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধিরা।
সরেজমিন ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে দেখা গেছে, শত শত পরিবার নদীর তীরে খোলা জায়গায় দিন কাটাচ্ছে। রান্না বা খাবারের কোনো ব্যবস্থা নেই। কেউ কেউ উঁচু বাঁধ ও স্বজনের আঙিনায় অমানবিক অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন; জরুরি ভিত্তিতে তাদের জন্য তাঁবু ও শুকনা খাবার প্রয়োজন। এ সময় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা আতোয়ার রহমান বলেন, ‘যখন
বাড়িঘর ভাঙতে শুরু
করে, তখন পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঘুম ভাঙে। ভাঙন থামলে তারা আবার ঘুমিয়ে পড়ে। বছরের পর বছর ধরে এই অবহেলা চলছে, অথচ স্থায়ী কোনো প্রতিরোধের উদ্যোগ নেই।’
কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মঞ্জু মিয়া বলেন, ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ভোরের পাখি চরের ১০০ বসতঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। হুমকিতে রয়েছে আরও ২০০ বসতঘর ও শতাধিক একর ফসলি জমি। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দ্রুত সরকারি সহায়তার দাবি জানান। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মশিয়ার রহমান বলেন, ‘ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করা হয়েছে এবং চেয়ারম্যান-মেম্বারের সহায়তায় ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। আপাতত সাময়িক ত্রাণ হিসেবে কিছু শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।’
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঈফফাত জাহান তুলি জানান, ‘ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহায়তায় তাৎক্ষণিকভাবে জিও ব্যাগ ফেলা শুরু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা জেলা প্রশাসক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা পৌঁছে দেওয়া হবে।’
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘খবর পাওয়ার পরপরই জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করা হয়েছে। তবে নদীভাঙন দেখা দিলে জিও টিউব বা জিও ব্যাগ ফেলা এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ে তথ্য প্রদান ছাড়া আমাদের তাৎক্ষণিক কিছু করার থাকে না। নদী খনন, ড্রেজিং, সঠিক নদীশাসন ও গতিপথ পরিবর্তন করা ছাড়া তিস্তার স্থায়ী ভাঙন রোখা সম্ভব নয়।’
- বিষয় :
- নদী