সবজি উৎপাদনে সমৃদ্ধ, সংরক্ষণে শূন্য
এস এম কাওসার, বগুড়া
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০৪ | আপডেট: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ১৩:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
বগুড়ায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ সবজি উৎপাদন হলেও সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় নষ্ট হচ্ছে এক লাখ টনের বেশি। কৃষি বিভাগের হিসাবে, গত অর্থবছরেই জেলার উৎপাদিত সবজির মধ্যে এক লাখ ১২ হাজার ৬৫৬ টন অবিক্রীত থেকে পচে নষ্ট হয়েছে। এসব সবজির আনুমানিক বাজারমূল্য ৩৯৫ কোটি টাকা। উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপচয়ের পরিমাণও। এতে কৃষক ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন আর বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য নষ্ট হয়ে দেশের খাদ্য ও অর্থনীতির ওপরও চাপ তৈরি করছে।
এ অবস্থায় অবিক্রীত সবজি সংরক্ষণে জেলার পাঁচ উপজেলায় পাঁচটি সংরক্ষণাগার নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে কৃষি বিভাগ। পাশাপাশি বগুড়া থেকে সবজি বিদেশে পাঠাতে বিমানবন্দরে কার্গো সার্ভিস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কৃষি বিভাগ বলছে, সংরক্ষণ ও রপ্তানি সুবিধা তৈরি হলে মৌসুমে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে সবজির দাম পড়ে যাওয়ার প্রবণতা কমবে এবং কৃষকরাও উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য পাবেন।
জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বগুড়ায় আলু ছাড়া বিভিন্ন সবজি আবাদ হয়েছে ২৪ হাজার ৯০০ হেক্টর জমিতে। এসব জমি থেকে উৎপাদন হয়েছে পাঁচ লাখ ২২ হাজার ৬৫২ টন সবজি। প্রতি কেজি গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা হিসাবে এসব সবজির বাজারমূল্য প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা।
উৎপাদিত সবজির মধ্যে জেলার অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হয়েছে দুই লাখ চার হাজার ৭৭৫ টন। উদ্বৃত্তের মধ্যে ৪৩ হাজার ২২৯ টন রপ্তানি হয়েছে এবং এক লাখ ১৪ হাজার ৩০০ টন গেছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। বীজ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে ৪৭ হাজার ৬৯২ টন। এরপরও অবিক্রীত থেকে গেছে এক লাখ ১২ হাজার ৬৫৬ টন সবজি।
উৎপাদন বাড়ছে, বাড়ছে অপচয়ও
কৃষি বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিবছর সবজির উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পচে নষ্ট হওয়া সবজির পরিমাণও বাড়ছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বগুড়ায় সবজি উৎপাদন হয়েছিল পাঁচ লাখ ১৬ হাজার ৮৬৭ টন। ওই বছর অবিক্রীত সবজির আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৯২ কোটি টাকা। এর আগের অর্থবছর ২০২৩-২৪ সালে উৎপাদন হয়েছিল পাঁচ লাখ ৯ হাজার ৪৮৯ টন এবং নষ্ট হওয়া সবজির মূল্য ছিল প্রায় ৩৮৮ কোটি টাকা।
অর্থাৎ, তিন অর্থবছরের ব্যবধানে উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি সবজি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতিও বেড়েছে। কৃষকদের ভাষ্য, মৌসুমের মাঝামাঝি বাজারে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ সবজি উঠলে দাম এতটাই কমে যায় যে অনেক সময় ক্ষেত থেকে হাটে নিয়ে যাওয়ার পরিবহন খরচও ওঠে না। তখন জমিতেই সবজি নষ্ট করা অথবা হাটে ফেলে আসা ছাড়া উপায় থাকে না।
বগুড়া থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় সবজি যায়। জেলার সবচেয়ে বড় সবজির মোকাম মহাস্থানহাট। শীত মৌসুমে এই হাট থেকে প্রতিদিন অন্তত ১০০ ট্রাক সবজি বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। তবে ভরা মৌসুমে সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম পড়ে যায়। তখন প্রতিদিনই কয়েক ট্রাক সবজি বিক্রি না হয়ে নষ্ট হয় বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
মহাস্থানহাটের সাবেক ইজারাদার ও সবজির আড়তদার তাহেরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায় ৩০ বছর ধরে সবজির পাইকারি ব্যবসা করছি। এ অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ সবজি উৎপাদন হলেও সে অনুযায়ী ক্রেতা নেই। উৎপাদন ও হাটে আমদানি বেড়ে গেলে দাম কমে যায়। তখন অনেকে সবজি ফেলে দিয়ে যান। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় নষ্ট সবজি শ্রমিক দিয়ে হাট থেকে পরিষ্কার করতে হয়।’
সংরক্ষণাগারের দাবি কৃষকদের
বগুড়ায় শীতকাল বা রবি মৌসুমে সবচেয়ে বেশি সবজি উৎপাদন হয়। মৌসুমের শুরুতে ও শেষে বাজারদর তুলনামূলক ভালো থাকলেও মাঝামাঝি সময়ে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ সবজি বাজারে ওঠায় দাম তলানিতে নেমে আসে। তখন টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, মুলাসহ বিভিন্ন সবজি কৃষকরা রাস্তায় ফেলে দেন কিংবা জমিতেই নষ্ট হতে দেন।
শিবগঞ্জ উপজেলার রায়নগর এলাকার কৃষক আজমল হোসেন বলেন, ‘তিন বিঘা জমির মধ্যে এক বিঘায় আলু, এক বিঘায় বাঁধাকপি এবং আরেক বিঘায় ফুলকপি ও মুলার আবাদ করি। কিন্তু প্রতিবছর ভরা মৌসুমে সবজির দাম কমে যায়। রাগ করে অনেক সময় সবজি মহাস্থানহাটে ফেলে দিয়ে আসি। আবার কখনও জমিতেই পচে নষ্ট হয়। আলু রাখার মতো সবজি সংরক্ষণের হিমাগার থাকলে আমার মতো অনেক কৃষক লাভবান হতেন।’
বগুড়া সদর উপজেলার শাখাররিয়া এলাকার কৃষক মন্তেজার রহমান বলেন, ‘গত রবি মৌসুমে দেড় বিঘা জমিতে ফুলকপি চাষ করেছিলাম। মৌসুমের শুরুতে পাইকারিতে ভালো দাম পেলেও মাঝামাঝি সময়ে দাম একেবারেই কমে যায়। এক পর্যায়ে গাড়ি ভাড়া দিয়ে বাজারে নিয়ে গেলেও ফুলকপি বিক্রি করে খরচ তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। বাধ্য হয়ে অনেক কপি জমিতেই নষ্ট করতে হয়েছে।’
একই উপজেলার রবিবাড়িয়া গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, ‘রবি মৌসুমের বড় একটা সময় রোজার মধ্যে ছিল। ওই সময় সবজির দাম অনেক কম ছিল। জমিতে বেগুনের ফলন ভালো হলেও ভালো দাম পাইনি। সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে অন্য সময়ে বিক্রি করে লাভবান হওয়া যেত।’
তিনি বলেন, ‘সংরক্ষণের কোনো উপায় নেই জেনে বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়। আবার কোনো কোনো দিন বিক্রি না করেই ফিরে আসতে হয়। তখন ফসল রাস্তার পাশে ফেলে দেওয়া বা গরুর খাবার করা ছাড়া উপায় থাকে না। সবজি সংরক্ষণ করা গেলে কৃষক যেমন ন্যায্য দাম পেতেন, তেমনি মানুষও সাধ্যের মধ্যে সবজি কিনতে পারত।’
কৃষি বিপণন বিভাগের সিনিয়র বিপণন কর্মকর্তা মোরশেদ আল মাহমুদ বলেন, সবজির মৌসুমে উৎপাদনের তুলনায় বাজারজাত সে পরিমাণ হয় না এবং সংরক্ষণেরও কোনো ব্যবস্থা নেই বিধায় অনেক সবজি পচে নষ্ট হয়ে যায়। এতে কৃষকদের অনেক ক্ষতি হয়।
সবচেয়ে বেশি উৎপাদন শিবগঞ্জে
জেলার আটটি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সবজি উৎপাদন হয় শিবগঞ্জে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ উপজেলায় দুই হাজার ৪১৪ হেক্টর জমিতে সবজি আবাদ হয়। উৎপাদন হয় প্রায় ৮৫ হাজার টন। এখানে বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো ও মুলার আবাদ বেশি।
স্থানীয় কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শিবগঞ্জে উৎপাদিত আলু ও বাঁধাকপির একটি অংশ রপ্তানি করে মহাস্থানের সাগর এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এরপরও উপজেলায় প্রায় ২২ হাজার টন সবজি অবিক্রীত থেকে পচে নষ্ট হয়।
কৃষি বিপণন বিভাগের মাঠ ও বাজার পরিদর্শক আবু তাহের বলেন, ‘সবজির বাজার একেক দিন একেক রকম। যেদিন বাজারে আমদানি বাড়ে, সেদিন দাম কমে। আবার আমদানি কমলে দাম বাড়ে। যেদিন দাম কমে, সেদিন সবজি রাখার ব্যবস্থা থাকলে কৃষকরা লাভবান হবেন।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোহেল মো. শামসুদ্দিন ফিরোজ বলেন, ‘কৃষকরা কষ্ট করে বছরজুড়ে ফসল উৎপাদন করলেও বেশির ভাগ সময় ন্যায্য দাম পান না। দাম না পেয়ে অনেক সময় তারা জমিতেই ফসল নষ্ট করেন বা রাস্তার ধারে ফেলে দেন। ন্যায্য দামের অনিশ্চয়তায় কৃষকরা দিন দিন সবজি উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। অথচ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে তারা উৎপাদিত সবজির ন্যায্য দাম পেতে পারেন।’
পাঁচ সংরক্ষণাগারের প্রস্তাব
সবজি দ্রুত পচনশীল পণ্য। তাই উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কোল্ড চেইন, সংরক্ষণাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারসংযোগ নিশ্চিত করা না গেলে কৃষকের উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল মিলবে না। বগুড়ায় যে পরিমাণ সবজি নষ্ট হচ্ছে, তা শুধু কৃষকের ক্ষতি নয়; এটি জাতীয় সম্পদেরও অপচয় বলছেন কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এ সংকট নিরসনে সবজি সংরক্ষণের জন্য বগুড়ার পাঁচ উপজেলায় পাঁচটি সংরক্ষণাগার নির্মাণের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। প্রস্তাবিত স্থানগুলো হলো শিবগঞ্জ, শাজাহানপুর, গাবতলী, বগুড়া সদর ও দুপচাঁচিয়া উপজেলা। সম্প্রতি এসব স্থানে সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি দল।
প্রকল্পটির উদ্যোক্তা শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান বলেন, ‘সংরক্ষণাগার নির্মাণের প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। আশা করছি দ্রুতই এটি বাস্তবায়ন হবে। সংরক্ষণাগারগুলো চালু হলে এ অঞ্চলের সবজি নষ্ট ও অপচয় কমবে এবং কৃষকরা লাভবান হবেন।’
এদিকে বগুড়ার সবজি বিদেশে রপ্তানির সুযোগ বাড়াতে বিমানবন্দরে কার্গো সার্ভিস চালুর উদ্যোগের কথাও সামনে এসেছে। গত ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়ার আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠের জনসভায় বগুড়া অঞ্চলের সবজি বিদেশে রপ্তানির জন্য বগুড়া বিমানবন্দরে কার্গো সার্ভিস চালুর কথা বলেন। এরপর থেকেই স্থানীয়ভাবে সবজি রপ্তানি ও সংরক্ষণ নিয়ে নানা পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
সবজি রপ্তানিকারক মহাস্থান এলাকার মেসার্স সাগর ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সাগর হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম পোর্টের মাধ্যমে সবজি রপ্তানি করতে সময় ও ব্যয় বেশি হয়। বগুড়া থেকে বিমানের কার্গোতে করে সবজি রপ্তানি করতে পারলে সুবিধা হবে। বিপুল পরিমাণ সবজি রপ্তানি করা যাবে।
সাগর হোসেনসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না; উৎপাদনের পর সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও রপ্তানির সুযোগ তৈরি করতে হবে। তা না হলে উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অপচয়ের পরিমাণও বাড়তে থাকবে। বগুড়ার সবজি দেশের বাজারে বিপণন বিদেশে পাঠানো গেলে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান বলেন, বগুড়া বিমানবন্দর থেকে কার্গো সার্ভিস চালু করার জন্য প্রক্রিয়া চলছে। এটা চালু হলে এ অঞ্চলের শাকসবজি সহজেই বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব হবে।
- বিষয় :
- সবজি