সরকারের উন্মুক্ত কয়লা খনির প্রস্তাবে তেল-গ্যাস কমিটির নিন্দা, প্রতিবাদ
ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:১৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লা খনি থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে প্রতিবাদ ও তীব্র নিন্দা প্রকাশ করেছেন এবং অবিলম্বে বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি।
গত ১৬ আগস্ট রাজধানীর হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সমাধানে সরকার নতুন নীতিগত পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিকল্প পথ খোঁজার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন আমরা ফুলবাড়ী এবং অন্যান্য স্থানে ওপেন-পিট কয়লা উত্তোলনের দিকে যাচ্ছি।’
এরই প্রতিবাদে বুধবার তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখার আহ্বায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েল স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ফুলবাড়ী ও বড়পুকুরিয়ায় উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনি বাস্তবায়নে বাণিজ্যমন্ত্রীর বক্তব্য তারা প্রত্যাখ্যান করছেন এবং এর তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।
সম্প্রতি আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনি চালু করার বিষয়ে যে বক্তব্য প্রদান করেছেন, কমিটি তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছে। কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশ ও জনস্বার্থবিরোধী এই বক্তব্য জাতীয় কমিটি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বর্তমানে দেশব্যাপী চলমান বিদ্যুৎ সংকটকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সরকার ও কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল মূলত দেশীয় সম্পদ লুটের এই জাতীয় স্বার্থবিরোধী প্রকল্প নতুন করে বাস্তবায়ন করতে চায়। শুধু ফুলবাড়ীই নয়, একই সঙ্গে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকেও পরিবেশ ধ্বংসকারী উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
কমিটির ভাষ্য, ২০০৬ সালে এশিয়া এনার্জি নামক একটি বহুজাতিক কোম্পানি মাত্র ৬ শতাংশ রয়্যালিটির বিনিময়ে ফুলবাড়ীর খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের চেষ্টা করে। এটি ছিল চরম বৈষম্যমূলক ও লুণ্ঠনমূলক চুক্তি, যার মাধ্যমে জাতীয় সম্পদ বিদেশে পাচারের পথ সুগম করা।
২০০৬ সালের গণআন্দোলনের স্মৃতিচারণ করে স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজনৈতিক সংগঠন উন্মুক্ত খনি ব্যবস্থার তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তাদের আশঙ্কা, উন্মুক্ত খনি হলে ফসলি জমি, ঘরবাড়ি, প্রাণ-প্রকৃতি পরিবেশের বিপর্যয় ঘটবে এবং ভূগর্ভে পানির লেয়ার নিচে নেমে যাবে। এতে আশপাশের স্থান বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে।
এদিকে, এ নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে বুধবার রাতে ফুলবাড়ী পৌর শহরের নিমতলা মোড়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে গণসংহতি আন্দোলন। এর আগে তারা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে।
এতে সভাপতিত্ব করেন গণসংহতি আন্দোলন, ফুলবাড়ী উপজেলা শাখার সদস্য সচিব ও জাতীয় পরিষদ সদস্য আব্দুল মোত্তালিব পাপ্পু। সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণসংহতি আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির নাজার আহম্মেদ।
বক্তারা বলেন, ফুলবাড়ীর মাটিতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের কোনো ষড়যন্ত্র জনগণ মেনে নেবে না। ফুলবাড়ীর মানুষ অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে জানে, উন্মুক্ত খনি শুধু কয়লা উত্তোলনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে মানুষের বসতভিটা, কৃষিজমি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা জড়িত।
বক্তারা আরও বলেন, ২০০৬ সালের ফুলবাড়ী গণআন্দোলনের শহীদ আমিন, সালেকিন ও তরিকুলের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ছয় দফা চুক্তি বাস্তবায়ন না করে নতুন করে উন্মুক্ত কয়লা খনির আলোচনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণের মতামত উপেক্ষা করে ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত খনি করার যে কোনো উদ্যোগের বিরুদ্ধে গণসংহতি আন্দোলন জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথে থাকবে।
তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখার আহ্বায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেন, ২০০৬ সালের মতো এই দেশবিরোধী চক্রান্ত সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে প্রতিহত করবে।
অন্যদিকে, স্থানীয় কিছু ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রাকৃতিক সম্পদ মাটির নিচে রেখে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করা ঠিক নয়।
- বিষয় :
- প্রতিবাদ