‘বৃষ্টি আইলে ঘরের চেয়ে বাইরে ভালা’
ছোট্ট পলিথিনের ঝুপড়ি ঘরে স্ত্রী নিয়ে বসবাস বৃদ্ধ আজমত আলীর। নালিতাবাড়ী পৌর শহরের আড়াইআনী ব্রিজপাড় এলাকা থেকে সম্প্রতি তোলা সমকাল
নালিতাবাড়ী (শেরপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৪৯ | আপডেট: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর। জীবনের পড়ন্ত বেলায় যেখানে একটু শান্তি, নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার কথা, সেখানে ৭২ বছর বয়সী আজমত আলীর নিত্যসঙ্গী অভাব আর অনিশ্চয়তা। স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর বসবাস একটি ছোট্ট পলিথিনের ঝুপড়ি ঘরে। বৃষ্টি নামলেই দুর্ভোগের সীমা থাকে না তাদের।
নালিতাবাড়ী পৌর শহরের আড়াইআনী ব্রিজপাড় এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন আজমত আলী ও তাঁর স্ত্রী আছিয়া খাতুন। এক ছেলে ও এক মেয়েকে মানুষ করে বিয়ে দিয়েছেন তারা। সন্তানদের নিজ নিজ সংসার হয়েছে। কিন্তু জীবনের শেষ সময়ে এসে এই দম্পতির নিজের বলতে নেই এক টুকরো জমি, নেই একটি নিরাপদ আশ্রয়।
ব্রিজের পাশেই পলিথিন দিয়ে তৈরি ছোট্ট একটি ঝুপড়ি ঘর তাদের আশ্রয়। চারপাশে ছেঁড়া পলিথিন, মাথার ওপরও পলিথিনের ছাউনি। নেই শক্ত দেয়াল, নেই টিনের ছাদ। সামান্য বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে পানি। ভিজে যায় বিছানাসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।
বৃষ্টির দুর্ভোগের কথা বলতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি আজমত আলী। চোখ মুছতে মুছতে বলেন, ‘বৃষ্টি আইলে (এলে) ঘরের চেয়ে বাইরে ভালা (ভালো)। বৃষ্টি আইলে ঘরে থাহার (থাকার) কুনু (কোনো) উপায় থাহে (থাকে) না।’
কথাটি শুধু একটি বৃদ্ধের আক্ষেপ নয়, বরং তাঁর প্রতিদিনের বাস্তবতার নির্মম চিত্র। যে ঘরটি হওয়ার কথা ছিল নিরাপদ আশ্রয়, বৃষ্টির সময় সেটিই হয়ে ওঠে ভয়ের কারণ। রাতের বৃষ্টিতে কখনও ঘরের ভেতর বসে থাকতে হয়, কখনও ভেজা বিছানা সরিয়ে শুকনো জায়গা খুঁজতে হয়। ঘুমহীন রাত কাটে বৃষ্টির শব্দ আর পানি সামলাতে সামলাতে।
বার্ধক্য তাঁকে থামাতে পারেনি। অভাবের সংসারে প্রতিদিন ঘরের পাশে সড়কে ছোট একটি ঝুপড়ি দোকানে পুরোনো, ছেঁড়া কাপড়-চোপড় ও মাটির তৈজসপত্র নিয়ে বসে থাকেন আজমত আলী। এসব বিক্রি করে সামান্য কিছু আয় হয়। সেই টাকা দিয়েই কোনোভাবে দুবেলা খাবারের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু প্রতিদিন যে বিক্রি হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। যেদিন বিক্রি হয় না, সেদিন সংসারের চুলা জ্বলে না।
অভাবের সঙ্গে যোগ হয়েছে নিজের ও স্ত্রীর অসুস্থতা। দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে ভুগছেন তারা। নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধের প্রয়োজন হলেও অর্থের অভাবে তা কেনা সম্ভব হয়ে ওঠে না। দিন শেষে যখন ঘরে ফেরেন, তখন অনেক সময় দেখতে পান– বৃষ্টির পানিতে ভিজে গেছে জিনিসপত্র। তখন নতুন করে শুরু হয় পানি সরানো, ভেজা জিনিসপত্র শুকানোর চেষ্টা।
আজমত আলী জানান, নিজের নামে বয়স্ক ভাতার একটি কার্ড পেয়েছেন। ভাতার টাকা পুরোটাই দুজনের ওষুধের পেছনে খরচ হয়ে যায়।
এক সময় সন্তানদের মানুষ করার জন্য নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছেন এই দম্পতি। ঘরে থাকার মতো অবস্থা নেই দেখে ছেলে তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে উঠেছেন। সেখানেই বসবাস করছেন। এখন সন্তানদের সংসার আলাদা। অথচ নিজেদের জীবনের শেষ আশ্রয়টুকু নিশ্চিত করতে পারেননি তারা। একটি নিরাপদ ঘরের স্বপ্ন তাদের কাছে এখনও অধরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, আজমত আলীর চাওয়া খুব বেশি নয়। তিনি চান, মাথার ওপর একটি টিনের ছাদ থাকবে, বৃষ্টির পানি ঘরে ঢুকবে না। স্ত্রীকে নিয়ে রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন। নালিতাবাড়ীর ইউএনও আব্দুল মালেক বলেন, ‘আমি খোঁজ নিয়েছি। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই বান ঢেউটিন দেওয়া হবে।’
- বিষয় :
- বৃষ্টি