নওগাঁর রাণীনগর
৯০ ব্রিজ-কালভার্টের মুখ বন্ধ করে পুকুর, বাড়ি
রাণীনগর উপজেলার কুবরাতলী-গোনা সড়কে ১৫ মিটার দীর্ঘ আরসিসি গার্ডার সেতুর মুখ বন্ধ করে মাছ চাষ করায় পানি চলাচল বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ছবি: সমকাল
ওহেদুল ইসলাম মিলন, রাণীনগর (নওগাঁ)
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ | ১০:২৮
নওগাঁর রাণীনগর উপজেলাজুড়ে অন্তত ৯০টি ব্রিজ ও কালভার্টের মুখ বন্ধ করে কোথাও বাড়ি নির্মাণ, কোথাও পুকুর খনন করা হয়েছে। আবার কোথাও নিজ থেকে ভেঙে পড়ে পানি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে বর্ষা মৌসুমে উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে, ফসলহানির পাশাপাশি প্রায় তিন হাজার বিঘা জমি অনাবাদি পড়ে থাকছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বসতবাড়ি ও স্থানীয় অবকাঠামোও।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তদারকির অভাব, প্রভাবশালীর দখলদারিত্ব এবং সমন্বয়হীনতার কারণে পানি চলাচলের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তারা অবিলম্বে সব অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ভাঙা কালভার্ট সংস্কার এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থায়ী পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
উপজেলার আটটি ইউনিয়ন পরিষদের ৭২টি ওয়ার্ডের মধ্যে অন্তত ৬৫ জন ওয়ার্ড সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পারইল ইউনিয়নে ১৪টি, একডালায় ১০টি, কালীগ্রামে ১৮টি, বড়গাছায় ১৯টি, খট্টেশ্বর রাণীনগরে ১১টি, কাশিমপুরে ৭টি, মিরাটে ৩টি এবং গোনা ইউনিয়নে ৮টি ব্রিজ-কালভার্টের মুখ বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে শুধু বড়গাছা ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডেই বন্ধ রয়েছে ১১টি ব্রিজ-কালভার্ট।
দপ্তর সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতায় উপজেলায় ৬২১টি এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন দপ্তরের আওতায় ৯৩৮টিসহ মোট ১ হাজার ৫৫৯টি ব্রিজ-কালভার্ট রয়েছে।
ঘোষগ্রাম পূর্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সাত্তার বলেন, ‘আমার দেড় বিঘা জমি আছে। পানি বের না হওয়ায় এবার ধান রোপণ করতে পারিনি।’ একই গ্রামের কৃষক আবদুল মালেক বলেন, ‘আমার তিন বিঘা জমি পানির নিচে। ঘোষগ্রাম, শাহপাড়া, হিন্দুপাড়া, মাঝিপাড়াসহ কয়েকটি গ্রামের কৃষকের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি বের হতে না পেরে আমার বোনের বাড়িতেও পানি ঢুকে পড়েছে।’
সরেজমিন রাণীনগর-আত্রাই সড়কের ঘোষগ্রাম বাঘারপুকুর এলাকায় দেখা যায়, স্থানীয় আসকান আলী একটি কালভার্টের মুখ আংশিক বন্ধ করে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন। এতে মাঠের পানি বের হতে না পেরে দেড় শতাধিক বিঘা জমি পানিতে নিমজ্জিত হয়ে আছে।
ভবন নির্মাণকারী আসকান আলী বলেন, ‘ভবনের নিচ দিয়ে পানি বের হওয়ার জন্য জায়গা রাখা হয়েছে। সড়কের মাঝখানে কালভার্ট ভেঙে দেবে যাওয়ায় পানি চলাচল বন্ধ হয়েছে।’
স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্য ইউনুস আলী বলেন, ‘পানি বের হতে না পারায় ৪০০-৫০০ বিঘা জমি জলাবদ্ধ হয়ে আছে। কয়েকশ পরিবার পানিবন্দি। এ বিষয়ে ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।’
বড়গাছা ইউনিয়নের ওয়ার্ড সদস্য অনিমেষ চন্দ্র জানান, শলিয়া গ্রামের পশ্চিমে মাঠের পানি নামার একমাত্র কালভার্টের মুখ মাটি ভরাট করে বন্ধ করে দিয়েছেন স্থানীয় ওয়াহেদ আলী। এতে প্রায় এক হাজার বিঘা জমির আবাদ ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
অভিযুক্ত ওয়াহেদ আলী বলেন, ‘পানি নামার জন্য কিছুটা জায়গা রেখেছি। তেমন কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’
উপজেলার কুবরাতলী-গোনা সড়কের গোনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে গত বছর প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৫ মিটার দীর্ঘ আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই ব্রিজের মুখ বন্ধ করে মাছ চাষ করছেন জাহাঙ্গীর আলম। ফলে পানি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।
অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘মাঠের পানি এসে পুকুরে পড়ে। এতে আমার সাত-আট লাখ টাকার মাছ ভেসে গেছে। তাই সাময়িকভাবে মুখ বন্ধ করেছি। পানি বেশি হলে শ্যালো মেশিন দিয়ে তুলে দিই।’
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ব্রিজ-কালভার্টের মুখ বন্ধ থাকায় প্রতি বর্ষা মৌসুমে প্রায় ২ হাজার ৮৫০ বিঘা জমি অনাবাদি থেকে যাচ্ছে। এতে কৃষকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।’
রাণীনগর এলজিইডি কর্মকর্তা ইসমাইল হোসেন এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, ‘অভিযোগ পাওয়ার পর কয়েকটি ব্রিজ-কালভার্টের মুখ খুলে দেওয়া হয়েছে। বাকি সমস্যাগুলোও পর্যায়ক্রমে সমাধানের চেষ্টা চলছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাকিবুল হাসান বলেন, ‘কয়েকটি অভিযোগ সরেজমিন তদন্ত করে সমাধান করা হয়েছে। অন্যান্য ব্রিজ-কালভার্টের অবস্থাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং ভেঙে যাওয়া ব্রিজ-কালভার্ট সংস্কার বা নতুন করে নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
- বিষয় :
- নওগাঁ