বন্ধুকে পাঠানো মামুনের শেষ বার্তা
‘জাহাজ ছেড়ে দেবে, শনিবার দুপুরের পর নেটওয়ার্কে পাবে’
মামুন বেঁচে আছেন কি না, জানতে চায় পরিবার
মো. আবদুল্লাহ আল মামুন
সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৪:২১
‘জাহাজ এখন ছেড়ে দেবে। শনিবার দুপুরের পর নেটওয়ার্কে পাবে।’ বাল্যবন্ধু সাদাত আল কাবিজুকে পাঠানো এটিই ছিল বাংলাদেশি মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মো. আবদুল্লাহ আল মামুনের শেষ ক্ষুদে বার্তা। শুক্রবার ওই বার্তা পাঠানোর পর ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও মামুনের মুঠোফোনে কোনো নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে না। তারও কোনো খোঁজ মেলেনি। তিনি বেঁচে আছেন কি না, তা-ও জানেন না পরিবারের সদস্যরা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মামুনের বড় ভাই আবদুল্লাহ আল বাকি বলেন, ‘মা আগে থেকেই হৃদরোগে আক্রান্ত। বাবার বয়সও ৭০ পেরিয়েছে। মামুনের দুটি সন্তান আছে। ছোট ছেলে মোয়াজের বয়স সাড়ে তিন বছর, বড় মেয়ে মারিফুল জান্নাতের বয়স সাড়ে ছয় বছর। সে বারবার বাবার কথা জিজ্ঞেস করছে। কিন্তু আমাদের কাছে কোনো উত্তর নেই। মামুন বেঁচে আছে কি না—এই প্রশ্নের উত্তর চাই।’
ভারতের ওডিশা উপকূলের কাছে বঙ্গোপসাগরে পানামার পতাকাবাহী পণ্যবাহী জাহাজ এমভি ওশান উইনার ডুবে যাওয়ার পর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন বাংলাদেশি মেরিন ইঞ্জিনিয়ার মো. আবদুল্লাহ আল মামুন। পারাদ্বীপ বন্দর থেকে লৌহ আকরিক নিয়ে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে যাত্রা করা জাহাজটি বন্দর থেকে প্রায় ২৪০ নটিক্যাল মাইল দূরে ডুবে যায়।
জাহাজটিতে ২৪ জন ক্রু ছিলেন। তাদের মধ্যে ২০ জন চীনা, তিনজন মিয়ানমারের এবং একজন বাংলাদেশের নাগরিক। দুর্ঘটনার পর মাত্র দুজন চীনা নাবিককে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। জাহাজডুবির ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও নিখোঁজ ২২ জনের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। নাবিকদের পরিণতি সম্পর্কে নিয়োগকারী চীনা প্রতিষ্ঠানও এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেনি।
২০১৩ সালে মেরিনার হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন মামুন। ২০১৪ সালে প্রথম জাহাজে চাকরি নেন তিনি। এর আগে আরও পাঁচটি জাহাজে কাজ করলেও ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে এমভি ওশান উইনারে তার এটিই ছিল প্রথম চুক্তি। ১৯৯৪ সালের ২ অক্টোবর তাঁর জন্ম। গত ২৬ এপ্রিল তিনি ওই জাহাজে যোগ দেন।
মামুনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাদাত আল কাবিজু বলেন, ‘গত রমজান মাসে আমরা দুই বন্ধু মিলে ওমরাহ করে এসেছি। মামুন আমার বাল্যবন্ধু। আবার তার স্ত্রী ফাতেমা তুজ জোহরা আমার কাজিন। মামুন যে জাহাজে চাকরি করত, সেই জাহাজের নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানেও আমি চাকরি করি। এসব কারণে আমাদের মধ্যে অনেক আগে থেকেই হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।’
সোমবার রাতে এসব কথা বলার সময় ঢাকা থেকে গাড়িতে করে সাতক্ষীরায় মামুনের বাড়ির দিকে যাচ্ছিলেন সাদাত। মামুনের সঙ্গে সর্বশেষ কথোপকথনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাতে সর্বশেষ কথা হয় আমাদের। সে আমাকে জানায়, জাহাজের মালিকপক্ষ তাকে কিছু চীনা মুদ্রা দিয়েছে। সেগুলো ডলারে পরিবর্তন করে দুই বন্ধু কোথাও বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল সে। এ নিয়ে আমরা কিছুক্ষণ খুনসুটিও করি। কে জানত, আমাদের আর কখনো একসঙ্গে ঘোরা হবে না। তার সঙ্গে হয়তো এটাই হবে আমার শেষ কথা।’
মামুনকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশা এখনো করছেন তার স্বজনরা। তবে সময় যত গড়াচ্ছে, সেই আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে বলেও মেনে নিচ্ছেন তাঁরা।
মামুনের বড় ভাই আবদুল্লাহ আল বাকি বলেন, ‘উত্তাল সাগরে টানা তিন দিন ভেসে থাকা দুঃসাধ্য। তবু আমার ভাইয়ের আশা ছাড়িনি। জীবিত কিংবা মৃত—যেভাবেই হোক, ভাইকে একনজর দেখতে চাই আমরা। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এখনো হাল ছাড়েনি। তবে উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার হলে ভালো হয়।’
বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন মো. আনাম চৌধুরী বলেন, ভারতের নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড যৌথভাবে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। এখনো মামুনের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে তাঁকে নিয়োগ দেওয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে।
অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘জাহাজে থাকা ২৪ জনের মধ্যে ইতিমধ্যে দুজন চীনা নাবিককে জীবিত উদ্ধার করা গেছে। মামুনকে উদ্ধারের বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন দপ্তরে ই-মেইল করা হয়েছে। তবে ৭২ ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ায় তাকে জীবিত উদ্ধারের আশা ক্ষীণ হয়ে আসছে।’
পানামার পতাকাবাহী চীনা মালিকানাধীন বাল্ক ক্যারিয়ার জাহাজটি প্রায় ১ হাজার ৭০০ টন লৌহ আকরিক বহন করছিল। শনিবার বেলা ১১টার পর হঠাৎ জাহাজটি একদিকে কাত হতে শুরু করে। মাত্র আট মিনিটের মধ্যে জাহাজটি ডুবে যায়। ফলে অধিকাংশ নাবিক লাইফবোট নামানোর সুযোগ পাননি। সবগুলো লাইফ জ্যাকেটও নামানো সম্ভব হয়নি। জাহাজটির বয়স ছিল ২৮ বছর।
শনিবার বেলা ১১টা ৪৮ মিনিটে ভারতের সামুদ্রিক উদ্ধার সমন্বয় কেন্দ্র জাহাজটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর পায়। পরে কাছাকাছি থাকা বাণিজ্যিক জাহাজ এমটি আইসোপোস রাত ৮টার দিকে দুজন নাবিককে জীবিত উদ্ধার করে। এরপর ভারতের কোস্টগার্ডের ‘বরদ’, ‘আনমোল’ ও ‘বিজিত’ নামের তিনটি টহল জাহাজ উদ্ধার অভিযানে যুক্ত হয়। তবে সোমবার রাত পর্যন্ত নিখোঁজ অন্য নাবিকদের উদ্ধারের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
- বিষয় :
- জাহাজ
- বঙ্গোপসাগর