ঢাকা বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬

১২ দিনের মাথায় সাফারি পার্কে ফিরল দুই হাতি

১২ দিনের মাথায় সাফারি পার্কে ফিরল দুই হাতি
×

ছবি- সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক ও গাজীপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ০২:৩৫

গাজীপুর সাফারি পার্কে দুই বছর থাকার পর চাঁদাবাজি ও নির্যাতনে অভিযুক্ত আগের লালন-পালনকারীদের জিম্মায় দেওয়া হয়েছিল হাতি ‘সম্রাট বাহাদুর’ ও ‘নিহারকলি’কে। তবে সেই জিম্মার মেয়াদ টিকেছে মাত্র ১২ দিন। শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে হাতি দুটিকে আবার নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে বন বিভাগ।

গত সোমবার মৌলভীবাজারের জুড়ী ও কমলগঞ্জ থেকে হাতি দুটিকে উদ্ধার করা হয়। পরে দুটি খোলা ট্রাকে করে গতকাল মঙ্গলবার ভোর ও সকালে তাদের গাজীপুর সাফারি পার্কে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। ভোর ৪টার দিকে নিহারকলি এবং সকাল ১০টার দিকে সম্রাট বাহাদুরকে পার্কের প্রধান ফটক দিয়ে ভেতরে নেওয়া হয়। বন বিভাগ জানিয়েছে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর নির্দেশে হাতি দুটিকে ফেরত নেওয়া হয়েছে। 

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সোমবার দুপুরে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার লাঠিটিলা সংরক্ষিত বনের কাছে সম্রাটকে পাওয়া যায়। সেখানে হাতিটিকে দিয়ে গাছ টানার কাজ করানো হচ্ছিল। বন বিভাগের কর্মকর্তারা তাকে হেফাজতে নেওয়ার পর তার শরীরে একাধিক ক্ষতচিহ্ন দেখতে পান।

জুড়ী রেঞ্জ কর্মকর্তা সাদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সম্রাটের মাথা ও শুঁড়ে একাধিক ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। সাত থেকে আট কিলোমিটার পথ হেঁটে আসায় হাতিটি ক্লান্ত ও তৃষ্ণার্ত ছিল।

লাঠিটিলা বিটের কর্মকর্তা মো. সাজন বলেন, হাতিকে দিয়ে কাজ করানোর সময় কথা না শুনলে মাহুতেরা লোহার ধারালো ধরনের বস্তু দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। সম্রাটের শরীরের ক্ষতও এভাবে হয়ে থাকতে পারে বলে তাঁর ধারণা।

অন্যদিকে কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বন এলাকা থেকে নিহারকলিকে হেফাজতে নেয় বন বিভাগ।

২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার পোলসার গ্রামে মাহুত নজরুল ইসলাম সম্রাট হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট হয়ে মারা যান। এরপর বন বিভাগ হাতিটিকে উদ্ধার করে। এর আগে ৩১ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের ভুলতা এলাকা থেকে নিহারকলিকে উদ্ধার করা হয়। অভিযোগ ছিল, হাতিটি দিয়ে রাস্তায় মানুষের কাছ থেকে অবৈধভাবে চাঁদা তোলা হতো। বেঁধে নির্যাতনের একটি ভিডিও-ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। উদ্ধারের পর হাতি দুটিকে পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে গাজীপুর সাফারি পার্কে রাখা হয়। তবে গত ১২ আগস্ট তাদের আগের লালন-পালনকারীদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, হাতি দুটি ফিরিয়ে নিতে তাদের লালন-পালনকারীরা বন বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে তদবির করে আসছিলেন। তাদের জিম্মায় দেওয়ার সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা সংগঠন পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান রাকিবুল হক। তিনি বলেন, অমীমাংসিত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে বা কী প্রক্রিয়ায় হাতি দুটিকে লালন-পালনকারীদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তা পরিষ্কার করা দরকার। জিম্মার শর্ত ভঙ্গের ঘটনা যদি ঘটে থাকে, তাহলে হাতি দুটিকে ফেরত দেওয়ার আগেই সেই শর্তগুলো কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল, সেটিও জানা প্রয়োজন।

রাকিবুল বলেন, হাতিগুলোকে ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ভুল হয়ে থাকলে, সেই সিদ্ধান্তের দায় কে নেবে, তা জনসমক্ষে পরিষ্কার করা উচিত। একই সঙ্গে আবার কেন হাতি দুটিকে ফিরিয়ে আনা হলো, তার ব্যাখ্যাও প্রয়োজন।

হাতি দুটিকে আবার গাজীপুর সাফারি পার্কে নেওয়ার পর তাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, প্রায় দুই বছর ধরে হাতি দুটি পার্কে শিকলবন্দি ছিল। গত ৬ ও ৭ আগস্ট এক দিনের ব্যবধানে গাজীপুর সাফারি পার্কে দুটি হাতির মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার পর পার্কে থাকা অন্য হাতিগুলোর নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই সম্রাট ও নিহারকলিকে পার্কের বাইরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

রাকিবুল হক বলেন, সম্প্রতি পার্কে এক দিনের ব্যবধানে দুটি হাতির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে সম্রাট ও নিহারকলিকে আবার পার্কে নেওয়ার পর তাদেরও কি শিকলবন্দি করে রাখা হবে, নাকি উন্মুক্ত ও নিরাপদ পরিবেশে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে– এটি বড় প্রশ্ন।

এর আগে হাতি দুটিকে কোন শর্তে, কার অনুমোদনে এবং কী প্রক্রিয়ায় জিম্মায় দেওয়া হয়েছিল, তা জানতে বন বিভাগের কাছে লিখিতভাবে তথ্য চেয়েছিল পিপল ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন।

সাফারি পার্কে ফেরার পর গতকাল হাতি দুটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়। এরপর গোসল করিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে রাখা হয়। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ফিরে আসা প্রাণী দুটির শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে রেখেছে পার্ক কর্তৃপক্ষ।

আরও পড়ুন

×