ডিমে লোকসান-ফিডে ‘আগুন’ মহাসড়কে প্রান্তিক খামারিরা
গাজীপুরে পোলট্রি খাতের সমস্যা সমাধানের দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার খামারিদের বিক্ষোভ মিছিল সমকাল
গাজীপুর প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৫৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
দুই মাস আগে গাজীপুরের শ্রীপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ওপর ভেঙে ফেলা হয়েছিল শত শত ডিম। লোকসান, ঋণের বোঝা আর একের পর এক খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রতিবাদে এভাবে ডিম ভেঙে ছিলেন প্রান্তিক খামারিরা। দুই মাস পরও সেই সংকট কাটেনি। বরং ডিমের লোকসানের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে পোলট্রি, গবাদিপশু ও মৎস্য খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি। উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কিন্তু ডিম ও মুরগির ন্যায্য দাম মিলছে না। ফলে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে আবারও মহাসড়কে নামতে হয়েছে প্রান্তিক খামারিদের।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে শ্রীপুরের জৈনাবাজার এলাকায় ‘খামারি বাঁচলে দেশ বাঁচবে’ স্লোগানে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেন বাংলাদেশ প্রান্তিক পোলট্রি খামারি ঐক্য পরিষদের নেতাকর্মীরা। এতে দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত মহাসড়কের ময়মনসিংহমুখী লেনে যান চলাচল ব্যাহত হয়। পরে পোলট্রি ফিডের দাম কমানোর আলিটমেটাম দিয়ে সড়ক ছাড়েন খামারিরা।
তাদের অভিযোগ, একটি পোলট্রি খামারের মোট উৎপাদন ব্যয়ের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই খাদ্য বাবদ খরচ হয়। সাম্প্রতিক সময়ে প্রতি কেজি ফিডে প্রায় দুই টাকা এবং প্রতি বস্তায় ১০০ থেকে ১১২ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। এতে দুই হাজার মুরগির একটি খামারে মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। অন্যদিকে ডিম ও মুরগির বাজারে উৎপাদক পর্যায়ে সেই বাড়তি ব্যয় সমন্বয় করার মতো দাম পাওয়া যাচ্ছে না। আন্দোলনে অংশ নেওয়া খামারিরা জানান, একটি ডিম উৎপাদনে গড়ে ১০ টাকা ৫০ পয়সা খরচ হলেও পাইকারের কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে ১০ টাকা ৩০ পয়সায়। অর্থাৎ প্রতিটি ডিমে লোকসান হচ্ছে ২০-৩০ পয়সা। টানা প্রায় ৮ মাস এমন পরিস্থিতি চলায় অনেক খামারি ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছেন। কেউ খামার বন্ধ করেছেন, আবার কেউ বন্ধ করার সিদ্ধান্তের দ্বারপ্রান্তে চলে গেছেন।
বাংলাদেশ প্রান্তিক পোলট্রি খামারি ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. রাসেল মিয়া বলেন, পোলট্রি খাতের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তারা দীর্ঘদিন ধরে খামারিদের পাশে আছেন। এর আগে ডিমের দাম কমে গেলে তারা প্রতিবাদ করেছিলেন। তখন সরকারের পক্ষ থেকে শুল্ক কমিয়ে উৎপাদন খরচ কমানোর আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ফিডের দাম কমার পরিবর্তে আরও বেড়েছে।
পোল্ট্রি খামারি নেতা ও আজিরন পোল্ট্রি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তোফাজ্জল হোসেন বলেন, মুরগির বাচ্চা, খাদ্য ও ওষুধ-খামার পরিচালনার প্রতিটি উপকরণের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় ডিমের ন্যায্য দাম মিলছে না। ফলে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন প্রান্তিক খামারিরা। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে অনেকেই এখন খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে এক সময় ছোট ও প্রান্তিক খামারগুলো টিকে থাকবে না। বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদক পর্যায়ে ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকর হস্তক্ষেপের দাবি জানান তিনি।
ঐক্য পরিষদের সভাপতি আসাদুজ্জামান মামুন বলেন, ৩০ আগস্টের মধ্যে পোলট্রি খাদ্যের দাম কমাতে হবে। অন্যথায় ১ সেপ্টেম্বর ‘কাফনের কাপড়’ পরে আবারও রাস্তায় নামবেন তারা।
শ্রীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন বলেন, শ্রীপুরে সাড়ে ৩ শতাধিক পোলট্রি খামার রয়েছে। এসব খামার থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৩ লাখ ডিম উৎপাদিত হয়। গাজীপুর জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের হিসাবে জেলায় খামারের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। এসব খামারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা।
- বিষয় :
- খামারি