বর্জ্য ফেলা হচ্ছে পাঁচ নদী-খালে
সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া ইউনিয়নের বাজার ও বাসাবাড়ির বর্জ্য ফেলা হচ্ছে মেনিখালী নদীতে। এতে দূষিত হচ্ছে পানি ও পরিবেশ। শুক্রবার তোলা সমকাল
শাহাদাত হোসেন রতন, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ)
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০৯ | আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে আবাসিক ও বাজার এলাকার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে আশপাশের অন্তত পাঁচটি নদী ও খালে। কোথাও কোথাও মহাসড়কের পাশে এমনকি নিচু জমিতেও বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এতে নদী-খাল ও পরিবেশ দূষিত হয়ে হুমকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য। নোংরা আবর্জনা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও দুর্গন্ধে দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয়রা। পর্যটন এলাকা হওয়ায় বিব্রতকর পরিস্থিতে পড়ছেন পর্যটকরা। ক্ষুণ্ন হচ্ছে এলাকার ভাবমূর্তি।
উপজেলার সোনারগাঁ পৌরসভা, মোগরাপাড়া ইউনিয়ন, কাঁচপুর ইউনিয়ন ও পিরোজপুর ইউনিয়নে সাম্প্রতিক সময়ে এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এসব এলাকায় দ্রুত নগরায়ণের ফলে তৈরি হয়েছে শত শত বহুতল ভবন আর এসব ভবনের অসংখ্য ফ্ল্যাটে প্রতিদিন তৈরি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ গৃহস্থালি বর্জ্য। এগুলো ফেলার জন্য যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও কোনো ডাম্পিং স্টেশন না থাকায় যত্রতত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলা হচ্ছে ময়লা-আবর্জনা। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকি।
বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট কোনো স্থান না থাকায় মোগরাপাড়া ও পিরোজপুর ইউনিয়ন এলাকার বর্জ্য ফেলা হচ্ছে মোগরাপাড়া চৌরাস্তা কাঁচাবাজার-সংলগ্ন মেনিখালী নদীতে। এটি মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী। ফলে নদীর পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। অন্যদিকে উপজেলার কাঁচপুর ইউনিয়নের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে কাঁচপুর নয়াবাড়ি বিসিক শিল্পনগরীর কাছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে।
সোনারগাঁ পৌরসভায় এতদিন একটি অস্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন থাকলেও জায়গাটি ব্যক্তি মালিকানাধীন হওয়ায় সেখানে আর বর্জ্য ফেলা যাচ্ছে না। এখন সেই জমি প্লট আকারে বিক্রি হচ্ছে। ফলে দুই মাস পৌর এলাকার বিভিন্ন রাস্তার পাশে স্তূপ আকারে জমা হচ্ছে বর্জ্য। এতে ওই এলাকায় তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। ঐতিহাসিক ও পর্যটন নগরী হিসেবে পরিচিত সোনারগাঁয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বর্জ্য ফেলার কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরেজমিন দেখা যায়, মেনিখালী ব্রিজের পাশে মেনিখালী নদীতে, উদ্ধবগঞ্জ ব্রিজের পাশে পঙ্খীরাজ খালে, ঐতিহাসিক পানাম সেতুর পাশের খালে, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দীঘিরপাড় ও টিপরদী খালে ফেলা হচ্ছে গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক বর্জ্য। এ ছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর নয়াবাড়ি, পিরোজপুর ইউনিয়নের আষাঢ়িয়ার চর, পৌর এলাকার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পৌর ভবনাথপুর, আদমপুর লেক সিটি এলাকায় ফেলা হচ্ছে বর্জ্য। স্থানীয় বাজারগুলোতে তৈরি হওয়া প্রাত্যহিক বর্জ্য প্রতিনিয়ত ফেলা হচ্ছে আশপাশের নিচু জমি ও জলাভূমিতে।
স্থানীয়রা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানের সাতটি ডাস্টবিন চুরি হয়ে যায়। পৌরসভার ময়লা সংগ্রহ কার্যক্রমও অনিয়মিত হয়ে পড়ে। বর্তমানে পৌর এলাকায় কোনো ডাস্টবিন না থাকায় যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলা হচ্ছে।
সোনারগাঁ পৌর এলাকার আদমপুর গ্রামের গৃহবধূ আফিয়া খাতুন বলেন, এক সময় প্রতিদিন সকালে পৌরসভার লোক এসে ময়লা আবর্জনা নিয়ে যেত। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে তারা নিয়মিত আসে না। ১০-১২ দিন পর পর এসে ময়লা নিয়ে যায়। এতে ময়লা জমে স্তূপ হয়ে যায়। দুর্গন্ধে এলাকায় থাকা যায় না।
পিরোজপুর গ্রামের বাসিন্দা মোবারক হোসেন বলেন, এলাকার বাসাবাড়ির বর্জ্য ফেলার জন্য নির্দিষ্ট স্থান না থাকায় তা নদীতে ফেলা হচ্ছে। ফলে নদীর পানির দূষিত হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি এ এলাকায় দুগর্ন্ধে চলাফেলা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পরিবেশ উন্নয়ন সোসাইটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, সোনারগাঁ পর্যটন নগরী হওয়ায় রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা উচিত প্রশাসনের। পর্যটন নগরীর গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্থান পৌর এলাকায় হওয়ায় প্রতিদিন কয়েক হাজার পর্যটক এখানে ঘুরতে আসেন। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা বিমুখ হলে পর্যটন শিল্প হুমকিতে পড়বে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সোনারগাঁ শাখার সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মামুন বলেন, পৌরসভা ও উপজেলার সমন্বয়ে দ্রুত একটি আধুনিক স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন স্থাপন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, বাজার ও পর্যটন কেন্দ্র এলাকাগুলোতে প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ে ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার করে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগ জরুরি।
সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সোনারগাঁ পৌরসভার প্রশাসক আসিফ আল জিনাত জানান, সোনারগাঁয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কোনো ডাম্পিং স্টেশন না থাকার কারণে এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। স্থায়ী ডাম্পিংয়ের জন্য জায়গা খোঁজা হচ্ছে।
- বিষয় :
- বর্জ্য অপসারণ