ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মজুরি বাড়ানোর দাবিতে অটল চা শ্রমিকরা

মজুরি বাড়ানোর দাবিতে অটল চা শ্রমিকরা
×

মজুরি বাড়ানোর দাবিতে গতকাল শুক্রবার হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাটে কাপাই চা বাগন শ্রমিকদের মানববন্ধন কর্মসূচি সমকাল

মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

হবিগঞ্জের মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলার চা বাগানগুলোতে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলনে অটল রয়েছেন চা শ্রমিকরা। দাবি আদায়ে গত আট দিন ধরে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করছেন তারা। চুনারুঘাট উপজেলার ১৮টি চা বাগানসহ বিভিন্ন বাগানে শ্রমিকদের এই কর্মসূচি চলছে। শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, দাবি মেনে নেওয়া না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
চা শ্রমিকদের অভিযোগ, বাগানের সূচনালগ্ন থেকেই তারা বিভিন্ন বঞ্চনা ও শোষণের মধ্যে জীবনযাপন করে আসছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে দৈনিক ১৮৭ টাকা মজুরি দিয়ে একটি পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সংগতি রেখে তারা দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবি জানিয়েছেন।

শ্রমিকরা জানান, ২০২২ সালে ধারাবাহিক আন্দোলনের পর তাদের দৈনিক মজুরি ৫০ টাকা বাড়িয়ে ১৮৭ টাকা করা হয়েছিল। সম্প্রতি চা বাগান মালিকপক্ষ আরও ৫ শতাংশ মজুরি বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তবে শ্রমিকরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দৈনিক ৫০০ টাকা হাজিরা আদায়ের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
চুনারুঘাট চান্দপুর চা বাগানের শ্রমিক নেত্রী খাইরুন আক্তার বলেন, চা শ্রমিকরা যুগের পর যুগ বাগানে কঠোর পরিশ্রম করে আসছেন। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে কাজ করলেও তারা ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন না। বর্তমানে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম অনেক বেড়েছে। অথচ একজন শ্রমিক সারাদিন কাজ করে মাত্র ১৮৭ টাকা পান।
খাইরুন আরও বলেন, চা শ্রমিকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, নিরাপদ পানীয় জল ও চিকিৎসার সুবিধা দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক বাগানে এসব সুবিধা নামমাত্র। ফলে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। তাদের ন্যায্য দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।

চান্দপুর চা বাগানে খাইরুন আক্তারের সঙ্গে গীতা রানী কানু, মোহন রবিদাসসহ ছাত্র, যুবক ও সাধারণ শ্রমিকরা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
তবে শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছে চা বাগান মালিকপক্ষ। তাদের দাবি, বর্তমানে চা শিল্প বিভিন্ন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অনেক বাগান প্রতিবছর লোকসান গুনছে। এক কেজি চা উৎপাদনে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি খরচ হলেও সেই অনুপাতে চায়ের দাম ও বাজার বাড়েনি। গ্যাস, বিদ্যুৎ, সার, কীটনাশক, পরিবহন ও যন্ত্রপাতিসহ উৎপাদনের প্রায় সব খাতেই ব্যয় বেড়েছে।
বৈকুণ্ঠপুর চা বাগানের শামসুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, তাদের বাগানে প্রতিবছর লোকসান হচ্ছে। ব্যাংকের ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। উৎপাদিত চায়ের দাম আশানুরূপ না হওয়ায় বাগান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

নোয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার সোহাগ মাহমুদ জানান, অর্থ সংকটের কারণে তাদের কারখানা প্রায় দুই বছর বন্ধ ছিল। বর্তমানে কারখানা চালু হলেও পূর্ণ সক্ষমতায় চা উৎপাদন করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণ পাওয়া যাচ্ছে না এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যার কারণে নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরী বলেন, চা শ্রমিকদের দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরির দাবি যুক্তিযুক্ত। শ্রমিকরা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাগানে কঠোর পরিশ্রম করেন, অথচ সেই তুলনায় তাদের মজুরি খুবই কম। বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ করা জরুরি।
শ্রমিক নেতারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতিসহ আন্দোলন চলবে। দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান না হলে আগামী দিনে আন্দোলন আরও জোরদার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরও পড়ুন

×