জ্বালানি সংকটে পটিয়ার লবণশিল্প
‘কারখানায় কাজ নেই, মজুরি নেই- সংসার চলবে কীভাবে’
ছবি: সমকাল
আহমদ উল্লাহ, পটিয়া (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২১:৪২
‘কারখানায় কাজ নেই, মজুরি নেই- সংসার চলবে কীভাবে’ প্রশ্ন চট্টগ্রামের পটিয়ার ইন্দ্রপুল লবণশিল্পের শ্রমিক সালাউদ্দিনের। তিনি বলেন, ‘যতক্ষণ কারখানা চলে, ততক্ষণ কাজ থাকে। কাজ কমে যাওয়ায় এখন মজুরিও কমেছে। এতে সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’
মঙ্গলবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত পটিয়ার ইন্দ্রপুলের বিভিন্ন লবণ কারখানা ঘুরে দেখা যায়, স্বাভাবিক সময়ের কর্মচাঞ্চল্য নেই। কোনো কারখানায় সীমিত পরিসরে উৎপাদন চলছে, আবার কোথাও মেশিন বন্ধ রেখে শ্রমিকরা বসে রয়েছেন। অনেকে আাবার কাজের জন্য কারখানায় এসে উৎপাদন শুরুর অপেক্ষায় আছেন।
শ্রমিকেরা জানান, আগে টানা কয়েক ঘণ্টা কাজ করার সুযোগ থাকলেও বিদ্যুৎ চলে গেলে বা গ্যাসের চাপ কমে গেলে মেশিন বন্ধ হয়ে যায়। তখন তাদেরও বসে থাকতে হয়। অনেক সময় নির্ধারিত কর্মঘণ্টার আগেই কাজ শেষ হয়ে যায়। এতে কর্মঘণ্টা কমার পাশাপাশি উৎপাদনভিত্তিক মজুরি হওয়ায় আয়ও কমে গেছে।
ইন্দ্রপুলের শ্রমিকদের বড় একটি অংশ দৈনিক ও উৎপাদনভিত্তিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল। একদিন কাজ কমে যাওয়া মানেই তাদের একদিনের আয় কমে যাওয়া। টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ, বাড়িভাড়া ও সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে জানান তারা।
কমেছে উৎপাদন, বাড়ছে ক্ষতি
ইন্দ্রপুলে প্রায় ৪০টি লবণ কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে চালু আছে প্রায় ৩০টি। শিল্পমালিকদের হিসাবে, আগে এসব কারখানায় প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। বর্তমানে কাজ করছেন প্রায় ৪ হাজার। সংকট দীর্ঘ হলে কয়েক হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
ইন্দ্রপুলের মোস্তফা সল্ট, করিম সল্ট ও আনোয়ারা ট্রেড- এই তিনটি বড় লবণ কারখানা গ্যাসনির্ভর। মালিকদের দাবি, গত এক মাসে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। আগে দৈনিক প্রায় ২ হাজার টন লবণ উৎপাদন হলেও এখন হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টন। অর্থাৎ প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৮০০ টন উৎপাদন কমছে।
মোস্তফা সল্টের পরিচালক মুজিরুল হক সিদ্দিকী বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে। গ্যাস না থাকলে কারখানা বন্ধ রাখতে হয়। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ সংকট যোগ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। আগামী তিন থেকে ছয় মাসেও সংকটের সমাধান না হলে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, এর প্রভাব পড়বে শ্রমিক, লবণচাষি, পরিবহন শ্রমিকসহ পুরো শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজারো মানুষের জীবিকায়।
লবণ মিল মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য ও ইসলামাবাদ সল্ট ইন্ডাস্ট্রির স্বত্বাধিকারী ওয়াহিদ সামাদ হেলাল বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে গত এক মাসে প্রায় ২০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা ক্ষতি হচ্ছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় অর্ডার বাতিল ও সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে।
তিনি জানান, গ্যাস সংকটের বিষয়টি কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডকে (কেজিডিসিএল) লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। অক্টোবর থেকে সংকট কমে আসবে বলে তাঁদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। ইন্দ্রপুলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি আর্থিক প্রণোদনা ও ব্যাংকঋণ পুনর্বিন্যাসের দাবি জানিয়েছেন তারা।
একে সুলতানপুরী সল্টের স্বত্বাধিকারী মুহাম্মদ ফারুক বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদনপ্রক্রিয়া বারবার থেমে যায়। দুই ধরনের জ্বালানির সরবরাহই স্বাভাবিক করা দরকার।
মোহাম্মদী সল্টের মালিক জসিম উদ্দিন বলেন, উৎপাদন কমে যাওয়ায় কাঁচা লবণ কেনা থেকে শুরু করে পরিবহন ও বাজারজাত- সব পর্যায়েই প্রভাব পড়ছে।
আইয়ুব আলী সল্টের স্বত্বাধিকারী মোরশেদ বলেন, সংকট দীর্ঘ হলে ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলোর টিকে থাকা কঠিন হবে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কারখানা বন্ধের ঝুঁকি রয়েছে।
‘আগে আট ঘণ্টা, এখন কাজ পাঁচ ঘণ্টা’
ইন্দ্রপুল লবণ শ্রমিক সমিতির সভাপতি মুহাম্মদ এয়াকুব বলেন, আগে শ্রমিকেরা দিনে প্রায় আট ঘণ্টা কাজ করতেন। এখন অনেকের কাজ পাঁচ ঘণ্টায় নেমে এসেছে। উৎপাদনভিত্তিক মজুরি হওয়ায় আয়ও কমেছে।
ইসলামাবাদ সল্টের শ্রমিক বেলাল বলেন, ‘কখন কাজ হবে, কখন কারখানা বন্ধ থাকবে-এ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হচ্ছে।’
আরেক শ্রমিক বাবুল হক বলেন, ‘এভাবে সংকট চলতে থাকলে অনেক শ্রমিকের কাজ চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
যা বলছে গ্যাস ও বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ
গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) মোহাম্মদ রফিক খান বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে যতটুকু গ্যাস বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে, সেটিই বিতরণ করা হচ্ছে। বড় শিল্প গ্রাহকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া গ্যাসের ব্যবহার সীমিত রাখার অনুরোধ করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) পটিয়া নির্বাহী প্রকৌশলী আ স ম রেজাউন নবী বলেন, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনায় চাহিদা বেশি থাকায় সামগ্রিকভাবে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোড ব্যবস্থাপনা করতে হচ্ছে। এর প্রভাব পটিয়ার শিল্পাঞ্চলেও পড়ছে।
তিনি বলেন, এ কারণে ইন্দ্রপুলের লবণ কারখানাগুলোতে সব সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হলে পটিয়াতেও সংকট কমে আসবে বলে আশা করেন তিনি।
৭৪ বছরের পুরোনো লবণশিল্প
পটিয়ার ইন্দ্রপুলে লবণশিল্পের ইতিহাস প্রায় ৭৪ বছরের। ১৯৫২ সালের দিকে চানখালী খালকে কেন্দ্র করে এ এলাকায় লবণশিল্পের সূচনা হয়। তখন দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা থেকে নৌপথে কাঁচা লবণ এনে চানখালী খালের তীরে জমা করা হতো। পরে সেই লবণ প্রক্রিয়াজাত ও পরিশোধনের মাধ্যমে বাজারজাত শুরু হয়।
ধীরে ধীরে লবণ ব্যবসাকে ঘিরে ইন্দ্রপুলে গড়ে ওঠে একের পর এক কারখানা। চট্টগ্রাম শহর ও বন্দরকেন্দ্রিক বাণিজ্যব্যবস্থার সঙ্গে সড়ক ও নৌপথে যোগাযোগের সুবিধাও এই শিল্পের বিকাশে ভূমিকা রাখে। একদিকে কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের উপকূলীয় লবণ উৎপাদন অঞ্চল, অন্যদিকে চট্টগ্রাম নগর ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজার- এই দুইয়ের মধ্যে সংযোগস্থল হিসেবে ইন্দ্রপুলের গুরুত্ব বাড়তে থাকে।
কাঁচা লবণ ইন্দ্রপুলে এনে প্রক্রিয়াজাত করার পর ট্রাকসহ বিভিন্ন পরিবহনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়। এ শিল্পকে ঘিরে কাঁচা লবণ পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, গুদামজাতকরণ, বস্তাবন্দী ও প্যাকেজিং, পণ্য পরিবহন এবং বাজারজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন হাজারো মানুষ। কয়েক দশকের ব্যবধানে ইন্দ্রপুলের লবণশিল্প পটিয়ার অন্যতম পরিচিত শিল্পকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
- বিষয় :
- পটিয়া
- লবণ
- শ্রমিক
- গ্যাস সংকট
- বিদ্যুৎ