ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ফার্মেসি সাত শতাধিক, লাইসেন্স আছে মাত্র ৯০টির

ফার্মেসি সাত শতাধিক, লাইসেন্স আছে মাত্র ৯০টির
×

 এস এম প্রভাত, আড়াইহাজার (নারায়ণগঞ্জ)

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার দুটি পৌরসভা ও ১০টি ইউনিয়নে সাত শতাধিক ওষুধের দোকান বা ফার্মেসি রয়েছে। এগুলোর মধ্যে মাত্র ১৯০টির লাইসেন্স আছে। তবে বৈধ বা নবায়নকৃত লাইসেন্সধারী ফার্মেসি রয়েছে ৯০টি। এ ছাড়া স্থানীয় পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে গড়ে উঠেছে বেশির ভাগ ফার্মেসি। ফার্মাসিস্টের পরিবর্তে সাধারণ কর্মচারীরাই সেখানে ওষুধ বিক্রি করছেন। বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতি আড়াইহাজার শাখা সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
ড্রাগ লাইসেন্স ও প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট ছাড়া ওষুধ বিক্রিতে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানছে না অনেক ফার্মেসি। অনেক দোকানের বিরুদ্ধে নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। 
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ অফিস বলছে, ফার্মেসিগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে সব শেষ কবে অভিযান চালানো হয়েছে বা কতটি মামলা দেওয়া হয়েছে তার কোনো তথ্য দিতে পারেনি অফিসটি।

উপজেলায় কতগুলো ফার্মেসি রয়েছে, তার সঠিক তথ্য উপজেলা প্রশাসনের কাছে নেই। বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতি আড়াইহাজার শাখা সূত্রে জানা যায়, আড়াইহাজারে দুটি পৌরসভা ও ১০টি ইউনিয়নে সাত শতাধিক ওষুধের দোকান বা ফার্মেসি রয়েছে। তবে বিভিন্ন সূত্রের বরাতে ধারণা করা যায়, উপজেলার বিভিন্ন বাজারে এক হাজার সাতশর বেশি ফার্মেসি রয়েছে। যেগুলোর বেশির ভাগেরই নেই ড্রাগ লাইসেন্স; নেই ফার্মাসিস্ট। ওষুধ বিক্রেতাদেরও প্রশিক্ষণ নেই। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছেন। 
বিশেষ করে কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় প্রত্যন্ত এলাকার রোগীরা বিশাল মেঘনা নদী পাড়ি দিয়ে উপজেলা সদরে গিয়ে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন না। তারা পার্শ্ববর্তী বাজারের ফার্মেসিতে গিয়ে রোগের বর্ণনা দিয়ে ওষুধ নেন। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু ফার্মেসি মালিক অসচেতন রোগীদের কাছে ভেজাল ও মানহীন ওষুধ বিক্রি করেন। 
উপজেলা সদরে আল আমিন ফার্মেসিতে ওষুধ কিনতে আসা গহরদী গ্রামের বাবুল মিয়া বলেন, এখন ফার্মেসিতে আর বিশেষজ্ঞ লোকের দরকার হয় না। ফার্মেসিতে যারা কাজ করেন তারাই ওষুধ দিতে পারেন। অনেক সময় উপস্থিত থাকা ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভরা বলে দেন কোন ওষুধ কখন এবং কী কাজে লাগে। সেই অনুযায়ী ওষুধ বিক্রি হয়। এ ছাড়া অনেক ফার্মেসিতে নিম্নমানের কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভরা ওষুধ বিক্রি করেন।  

গোপালদী এলাকার মাহবুব আলী নামে আরেক ক্রেতা বলেন, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে ভালো মানের ওষুধের চেয়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি কমিশন মেলে। এতে বেশি লাভের আশায় ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ বিক্রিতে আগ্রহী হন কিছু দোকানি। 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ফার্মেসির মালিক বলেন, এই উপজেলায় যে যার মতো ওষুধের ফার্মেসি দিয়ে বসেছেন। হাতেগোনা কয়েকজনের ফার্মাসিস্ট সার্টিফিকেট রয়েছে। আর অনেক দোকানের ড্রাগ লাইসেন্সই নেই।
বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতি আড়াইহাজার শাখার সভাপতি ও গোপালদী মনির ফার্মেসির স্বত্বাধিকারী মনির হোসেন জানান, গোপালদী বাজারে ৩৫টি ফার্মেসির মধ্যে সর্বোচ্চ ২৫টির ড্রাগ লাইসেন্স রয়েছে। আড়াইহাজার বাজারে ৪০টি ফার্মেসির মধ্যে মাত্র ২০টির লাইসেন্স রয়েছে। উপজেলার অন্যান্য এলাকায় ড্রাগ লাইসেন্স ছাড়াই সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ কিংবা পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে ওষুধের দোকান খুলে বসেছেন অনেকে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, আড়াইহাজারে অনেক ওষুধের দোকান রয়েছে। তবে হাতেগোনা কয়েকটি ফার্মেসিতে ডিপ্লোমাধারী ফার্মাসিস্ট আছেন। তিনি আরও বলেন, ১৯৪৬ সালের ড্রাগ রুল অনুযায়ী ফার্মাসিস্ট ও ড্রাগ লাইসেন্স ব্যতীত ওষুধ মজুত, প্রদর্শন ও বিক্রি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
আড়াইহাজার উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আসাদুর রহমান বলেন, ফার্মেসি পরিচালনায় একজন দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তির সার্বক্ষণিক ও ড্রাগ লাইসেন্স থাকা প্রয়োজন। এসবের ব্যত্যয় ঘটে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া অনুমোদনহীন ওষুধ বিক্রি ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সংরক্ষণকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে। 
নারায়ণগঞ্জ জেলা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের উপপরিচালক কেএম মুহসীনিন মাহবুব জানান, আড়াইহাজারে নিয়মিত অভিযান চালানো হয়ে থাকে এবং ড্রাগ লাইসেন্সবিহীন ফার্মেসিগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা দেওয়া হয়। তবে সব শেষ কবে অভিযান চালানো হয়েছে এবং কতটি মামলা দেওয়া হয়েছে, তার কোনো সঠিক তথ্য দিতে পারেননি তিনি। এ কর্মকর্তা জানান, ঔষধ প্রশাসনের জনবল সংকটসহ লজিস্টিকস সাপোর্ট পর্যাপ্ত না থাকায় অভিযান পরিচালনায় নানাবিধ সমস্যায় পড়তে হয় তাদের। 
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, সব শেষ গত ১৮ আগস্ট আড়াইহাজার পৌর বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তফিজুর রহমান ইমন। প্রথমে আল আমিন ফার্মেসিতে অভিযান চালিয়ে ফিজিশিয়ান স্যাম্পল রাখা, অননুমোদিত ওষুধ বিক্রি, সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি এবং ওষুধ বিক্রির রেজিস্ট্রার সংরক্ষণ না করার অপরাধে ফার্মেসিকে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ খবরে আশপাশের দোকানিরা ফার্মেসি বন্ধ করে পালিয়ে যান।

আরও পড়ুন

×