একবছরে দুইবার ভ্যান চুরি, দিশেহারা বৃদ্ধ দম্পতি
‘বছরের ওমাথায় একটা হারায়ছে, এমাথায় এটা হারালো, এহন আমরা চলব ক্যাম্বা’
ছবি- সমকাল
কুমারখালী (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৭:২২
‘ভ্যান চালায় সংসার চলে। ওর (ভ্যানের) উপরই আমরা নির্ভর। ভ্যানডা হারা গেছে। এহন আমরা চলব ক্যাম্বা। আমার চলার মতো তো আর পরিবেশ নাই। বছরের ওমাথায় একটা হারায়ছে, এমাথায় এটা হারালো। এ্যাম্বা হলি চলি ক্যাম্বা।’
কথাগুলো বলছিলেন মনোয়ারা খাতুন (৫৯)। তিনি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার যদুবয়রা ইউনিয়নের দক্ষিণ যদুবয়রা গ্রামের ভ্যানচালক মো. আব্দুল্লাহ বিশ্বাসের (৬৬) স্ত্রী। সংসারের একমাত্র উপার্জনের অবলম্বন ব্যাটারিচালিত ভ্যানটি চুরি হয়ে যাওয়ায় দিশেহারা এই বৃদ্ধ দম্পতি।
ভোটার আইডি কার্ড অনুযায়ী আব্দুল্লাহ বিশ্বাসের বয়স ৬৬ বছর। এই বয়সে বিশ্রাম নিয়ে দিন কাটানোর কথা। কিন্তু চার ছেলে সন্তান দারিদ্র্যের কারণে দিনমজুরের কাজ করেন। তাই ভ্যান চালিয়ে স্ত্রী, এক নাতি ও এক নাতিনসহ পরিবারের সদস্যদের সংসার চালাতেন আব্দুল্লাহ।
গত সোমবার দুপুরে পুলিশ পরিচয়ে যাত্রী সেজে এক ব্যক্তি তাকে অজ্ঞান করে উপজেলার পান্টি-যদুবয়রা সড়কের লালনবাজার এলাকা থেকে ভ্যানটি নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন আব্দুল্লাহ। সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও ভ্যানটির সন্ধান পাননি তিনি। মঙ্গলবার কুমারখালী থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন।
জানা গেছে, আব্দুল্লাহর মেঝে পাকা দুই কক্ষের টিনশেড ঘরে স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতিনসহ পরিবারের সদস্যদের বসবাস। প্রায় এক বছর আগে নিজ বাড়ি থেকেও একটি ভ্যান চুরি হয়েছিল। পরে দুটি এনজিও থেকে প্রায় ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে নতুন একটি ভ্যান কেনেন তিনি। বছর না পেরোতেই আবারও চুরি হলো তার একমাত্র উপার্জনের অবলম্বন।
বুধবার দুপুরে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশে টিনশেডের চৌচালা ঘর। ঘরের সামনে ভ্যান রাখার জায়গা থাকলেও সেখানে ভ্যান নেই। বারান্দায় ভ্যানের চার্জার নিয়ে বসেছিলেন বৃদ্ধ দম্পতি। তাঁদের চোখেমুখে হতাশার ছাপ।
মনোয়ারা খাতুন বলেন, ভ্যানই আমারে সম্বল ছিল। কিন্তু এক ভ্যান কয়বার কেনা যায়। এহন আর ভ্যান কেনার মতো কোনো পরিবেশ নেই। এহন কেউ যদি একটা সাহায্য করতনে, তাহলে আবার চলতি পারতাম।
আব্দুল্লাহ বিশ্বাস জানান, সোমবার দুপুরে যদুবয়রার এনায়েতপুর বাজার থেকে পুলিশ পরিচয়ে এক ব্যক্তি তার ভ্যানে ওঠেন। লালনবাজারে পৌঁছে ওই ব্যক্তি রাস্তায় দাঁড়িয়ে আরেকজনের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর হঠাৎ কী হয়েছে, তিনি বুঝতে পারেননি। মাথা ধরে নিচে বসে পড়েন। প্রায় আধা ঘণ্টা পর জ্ঞান ফিরলে দেখেন, স্থানীয় লোকজন তার মাথায় পানি দিচ্ছেন। কিন্তু ভ্যানটি নেই।
তিনি বলেন, দিনে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় হতো। সেই টাকা দিয়ে ঋণের কিস্তি ও সংসারের খরচ চলত। এখন ভ্যান হারিয়ে যাওয়ায় আয় বন্ধ হয়ে গেছে। তাই নতুন একটি ভ্যান কিনতে সবার সহযোগিতা চান তিনি।
প্রতিবেশী আলম মণ্ডল বলেন, আব্দুল্লাহ খুবই অসহায় ও দরিদ্র মানুষ। ভ্যানটি হারিয়ে পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি। একটি ভ্যানের ব্যবস্থা হলে আবারও তার সংসার চলবে।
কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, শয়তানের নিঃশ্বাসের খপ্পরে পড়ে ভ্যান হারিয়েছেন বৃদ্ধ আব্দুল্লাহ। তার লিখিত অভিযোগটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বৃদ্ধ দম্পতির পাশে দাঁড়াতে সমাজের বিত্তবানদের আহ্বান জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার। তিনি বলেন, লিখিত আবেদন করলে সাধ্যমতো সহযোগিতা করা হবে।