অনিয়ম-জালিয়াতি, ৩০ শিক্ষককে ফেরত দিতে হবে ১০ কোটি টাকা
বেলগাছা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিএম কলেজ
কমলগঞ্জের মুন্সিবাজারে ভিডিপি সদস্যদের উদ্যোগে পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি। শুক্রবার তোলা সমকাল
আনোয়ার হোসেন মিন্টু, জামালপুর
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৩৮ | আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব যাদের, তাদের একটি অংশের বিরুদ্ধে উঠেছে নিয়োগে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ। জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার বেলগাছা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিএম কলেজের ৩০ শিক্ষক-কর্মচারীর নিয়োগ বিধিসম্মত নয়। সরকারি কোষাগার থেকে তাদের নেওয়া বেতন-ভাতার প্রায় ১০ কোটি ২৮ লাখ টাকা ফেরত দিতে বলা হয়েছে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নেওয়া বেতন-ভাতা ফেরতযোগ্য।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে নিয়োগ-সংক্রান্ত
পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, অধ্যক্ষ এবিএম মোস্তফা কামালের নিয়োগ বিধিসম্মত নয়। ফলে তাঁর নেওয়া ৬৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা বেতন-ভাতা সরকারি কোষাগারে ফেরতযোগ্য।
একই অভিযোগে সহকারী অধ্যাপক আনিছুর রহমানের ৫৪ লাখ ২৬ হাজার, মনজুর কাদেরের ৫৪ লাখ ২৬ হাজার, প্রভাষক জাহাঙ্গীর আলমের ৪৫ লাখ ২২ হাজার, নাজমুল হাসানের ২৮ লাখ ২৬ হাজার, মাহফুজুল ইসলামের ২৮ লাখ ১৫ হাজার, ফরিদুল ইসলামের ২৬ লাখ ৯০ হাজার, মোস্তফা কামালের ২৬ লাখ ৯০ হাজার এবং শাহজাহান কবীরের ২৫ লাখ ৫৩ হাজার টাকা ফেরতযোগ্য।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে কারিগরি শাখার ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর ওমর ফারুকের ৩৭ লাখ চার হাজার, রুমানা আক্তারের ৩৬ লাখ ৩৫ হাজার, আফরোজা আক্তারের ৩৫ লাখ ৮৬ হাজার, রুবিনা
ইয়াসমিনের ৩৫ লাখ ৩১ হাজার, এসএম আবু হাশেমের ৩৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা ফেরতের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সহকারী শিক্ষক আবদুল আলীমের ২০ লাখ ৪০ হাজার, ফাহমিদা আক্তারের ১৮ লাখ ২৯ হাজার, ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর হেদায়েত উল্লাহর ১৮ লাখ ৮১ হাজার ও আকতার হোসেনের ১৪ লাখ ৯৫ হাজার এবং প্রদর্শক ফয়জুর রহমানের ১৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা ফেরত দিতে বলা হয়েছে।
মাধ্যমিক শাখার সহকারী প্রধান শিক্ষক সামছুল আলমের ২৯ লাখ ৭৬ হাজার, আলতাফুর রহমানের ৩৯ লাখ ৮৩ হাজার, শেখ আবদুল্লাহ আল মতিনের ৩৯ লাখ ৪১ হাজার, আবু বকর ছিদ্দিকের ৩৬ লাখ তিন হাজার, রফিকুল ইসলামের ৩৬ লাখ তিন হাজার, নয়া মিয়ার ৩৫ লাখ ৯৮ হাজার, তরিকুল ইসলামের ৩৩ লাখ ৯৫ হাজার এবং রমজান আলীর ৩৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতের সুপারিশ করা হয়েছে।
দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন লাইব্রেরি অ্যান্ড ইনফরমেশন সায়েন্স সনদ অর্জন করেছেন মাধ্যমিক শাখার সহকারী গ্রন্থাগারিক আব্দুল হক। তবে নির্ধারিত তিন বছরের মধ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা ইউজিসি অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে লাইব্রেরি সায়েন্সে ডিপ্লোমা অর্জন করেননি। ফলে তাঁর নেওয়া বেতন-ভাতার ১৬ লাখ তিন হাজার টাকা ফেরত দিতে হবে।
বিএম শাখার প্রভাষক কম্পিউটার শাহজাহান কবীর ২০১৩ সালে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ইন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং সনদ অর্জন করেন। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তাঁর যোগ্যতা ও নির্ধারিত শর্ত পূরণের বিষয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে। এ কারণে তাঁর নেওয়া বেতন-ভাতার ২৯ লাখ ৬৬ হাজার টাকা ফেরতযোগ্য।
সহকারী অধ্যাপক আনিছুর রহমানের দাখিল করা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ জাল প্রমাণিত হয়েছে বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে তাঁর নিয়োগ বিধিসম্মত হয়নি এবং তিনি সরকারি বেতন-ভাতা পাওয়ার যোগ্য নন। তাই তার নেওয়া ৬১ লাখ ২৭ হাজার টাকা ফেরতযোগ্য। এই শিক্ষকদের পরবর্তী সময়ে নেওয়া অর্থও ফেরতযোগ্য হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। মাধ্যমিক শাখার সহকারী শিক্ষক শিরিনা আক্তার ২০০৪ সালের ১৯ এপ্রিল যোগদান করেন। কর্মরত অবস্থায় তিনি ২০১০ সালে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড ডিগ্রি অর্জন করেন এবং ২০১২ সালের ১ নভেম্বর থেকে বিএড সুবিধায় উচ্চতর স্কেলে বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন। তবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র অনুযায়ী সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড না থাকায় তিনি ওই উচ্চতর স্কেলের সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নন।
ফলে ২০১২ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নেওয়া চার লাখ ৪০ হাজার টাকা ফেরতযোগ্য।
সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড না থাকায় উচ্চতর স্কেলে বেতন পাওয়ার যোগ্য নন সহকারী শিক্ষক জাকিয়া সুলতানাও। তারও চার লাখ ৪০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সমন্বিত কার্যালয় জামালপুরের উপপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) কামরুজ্জামান বলেন, অভিযোগটির অনুসন্ধানের অনুমতি চেয়ে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে পত্র দেওয়া হবে। অনুমোদন পাওয়া গেলে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জামালপুর জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. মুজাহিদ বিল্লাহ ফারুকীর ভাষ্য, শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় নিয়োজিত থেকে যারা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি শাহ মো. জুবায়ের জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্রডশিট জবাব দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর ব্যত্যয় ঘটলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শামছুল আলম বলেন, আগে অডিট রিপোর্টের জবাব জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে পাঠানো হতো। সে সময় সরকারি কোষাগারে ফেরতযোগ্য টাকা জমা দেওয়ার পর অভিযুক্তদের জবাব গ্রহণ করা হতো। এখন ওই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। বর্তমান নির্দেশনা অনুযায়ী অভিযুক্তরা সরাসরি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে জবাব দেবেন। জবাব সন্তোষজনক না হলে মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেবে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আফসানা তাসলিমের ভাষ্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর থেকে বিষয়টি তাদের জানানো হয়েছে। নির্ধারিত কোডের মাধ্যমে অভিযুক্ত শিক্ষকরা অবৈধভাবে উত্তোলিত বেতন-ভাতার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেবেন। সরকারি অডিট আপত্তির জবাব দেওয়া বা অন্য কোনো বিষয়ে প্রতিষ্ঠান প্রধান সরাসরি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করবেন।
নিয়োগে অনিয়ম ও সনদ জালিয়াতির বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলা হলে তারা কোনো সদুত্তর না দিয়ে বলেন, এ বিষয়ে যা বলার অধ্যক্ষ বলবেন।
বেলগাছা উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিএম কলেজের অধ্যক্ষ এবিএম মোস্তফা কামাল বলেন, অডিট রিপোর্টে অনেক অসংগতি ও ভিত্তিহীন অভিযোগ করা হয়েছে। তবে পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর থেকে যেভাবে চাওয়া হয়েছে, তারা সেভাবে ব্রডশিট জবাব দিয়েছেন।
জামালপুরের জেলা প্রশাসক ইউসুপ আলী বলেন, শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব যাদের, তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-জালিয়াতির অভিযোগ দুঃখজনক। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ইসলামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
- বিষয় :
- অনিয়ম