ঢাকা রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নদীতে ভেসে গেল সুখচাঁনের সুখ

নদীতে ভেসে গেল সুখচাঁনের সুখ
×

শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল করতে নামার আগে সেলফিতে নারী-শিশুসহ ছয়জন

শিবপুর (নরসিংদী) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২২:১৪

শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসলে নামার আগে সেলফি তোলেন নারী-শিশুসহ ছয়জন। তাদের মধ্যে পাঁচজন তলিয়ে যান। দুজনকে জীবিত তোলা গেলেও তিনজন নিখোঁজ হন। তাদের বাঁচাতে গিয়ে ডুবে মারা যান স্থানীয় এক যুবক। গত শনিবার তিনজনের লাশ উদ্ধার হয়। একজন এখনও নিখোঁজ। 

সৌদিপ্রবাসী মেজ জামাই ছুটিতে দেশে আসায় তিন মেয়ের পরিবারকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেন অটোরিকশাচালক মজিবুর রহমান সুখচাঁন। গত শুক্রবার দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর বাড়ির অদূরে শীতলক্ষ্যা নদীতে গোসল করতে যান তিন মেয়ের পরিবারের ছয় সদস্য। তাদের মধ্যে পাঁচজন নদীতে ডুবে যান। শিশু-সন্তানসহ মেজ মেয়ে শাহিনুরকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও লাশ হন মেজ জামাই ওবায়দুল্লাহ ও ছোট মেয়ে শান্তা। এখনও নাতি শান্তর সন্ধান মেলেনি। 

সুখচাঁনের বাড়ি নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের চরলাখপুর গ্রামে। বাড়ি থেকে শীতলক্ষ্যা নদী পাঁচ মিনিটের হাঁটাপথ। ওই নদীতে গোসলে নেমে ছোট মেয়ে, মেজ মেয়ের স্বামী ও বড় মেয়ের ছেলেকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গেছেন সুখচাঁন। বিলাপ করে তিনি বলেন, ‘এত কইরা কইলাম, নদীতে যাওয়ার দরকার নাই, অন্য কোনোখান থাইক্যা ঘুইরা আসো। আমার কতা শুনল না, তারা নদীতই গেল। এখন তিন মাইয়ার ঘরে তিনজন নাই।...এত কষ্ট কেমন সহ্য করমু?’

শনিবার বিকেলে লাখপুর গ্রামে সুখচাঁনের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, দোচালা টিনের বাড়ির ভেতর থেকে আহাজারির শব্দ ভেসে আসছে। প্রতিবেশী ও স্বজনেরা দুঃসময়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।

মজিবুর রহমান সুখচাঁন জানালেন, ছোট মেয়ে শান্তার বিয়ের সময় মেজ জামাই ওবায়দুল্লাহ সৌদিতে ছিলেন। ছোট জামাইয়ের সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর কখনও দেখা হয়নি। মেজ জামাইয়ের ছুটিও শেষের দিকে। এজন্য তিন মেয়ের পরিবারকে দাওয়াত করেছিলেন। গত শুক্রবার দুপুর ১২টার মধ্যে স্বামী-সন্তান নিয়ে মেজ মেয়ে শাহীনুর চলে আসেন। তারও আগে আসেন ছোট মেয়ে শান্তা ও বড় মেয়ের (আগেই অসুখে মারা গেছেন) একমাত্র ছেলে শান্ত। জুমার নামাজের পর সবাই একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করেন। দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে ওবায়দুল্লাহ কলপাড়ে গোসল করতে গেলে স্বজনরা নদীতে গোসল করতে যাওয়ার কথা বলেন। এরপরই তারা দল বেঁধে নদীতে গোসল করতে যান।

গত শুক্রবার শীতলক্ষ্যায় গোসলে নেমে পাঁচজন তলিয়ে যাওয়ার পর শিশু-সন্তানসহ এক নারীকে উদ্ধার করা হয়। তাদের উদ্ধার করতে গিয়ে নিখোঁজ হন স্থানীয় যুবক সৌরভ। পরদিন শনিবার তিনজনের লাশ উদ্ধার হলেও এখনও নিখোঁজ আছেন একজন। তাঁকে উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছে ফায়ার সার্ভিস। 

মারা যাওয়া তিনজন হলেন– গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার ভঙ্গাল এলাকার সৌদিপ্রবাসী ওবায়দুল্লাহ, কাপাসিয়া উপজেলার ফুলবাড়িয়া গ্রামের ইসমাইল চৌধুরীর স্ত্রী শান্তা আক্তার ও নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার দুলালপুর ইউনিয়নের লাখপুর গ্রামের মজনু মিয়ার ছেলে সৌরভ মিয়া। নিখোঁজ শান্তর বাড়ি টাঙ্গাইলে।

সুখচাঁনের প্রতিবেশী ও স্থানীয় ইউপি সদস্য নাসির উদ্দীন বলেন, দোচালা টিনের ঘরে স্ত্রী-ছেলেকে নিয়ে বসবাস করেন সুখচাঁন। ব্যাটারিচালিত একটি অটোরিকশা চালিয়ে আয়-উপার্জন করেন। তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়ে অনেকটা নির্ভার ছিলেন। কিন্তু গত  শুক্রবারের ঘটনার পর সুখচাঁন একেবারেই ভেঙে পড়েছেন।

নিখোঁজ একজনকে উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের অভিযান চলছে উল্লেখ করে শিবপুর থানার ওসি কোহিনুর মিয়া জানান, কোনো অভিযোগ না থাকায় পরিবারের সদস্যদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই তিনজনের লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

×