‘স্বামীকে কাঁধে নিয়ে নামার সময় হুড়োহুড়িতে পড়ে যাই, পরে শুনি তিনি পদদলিত হয়ে মারা গেছেন’
নিহতের স্বজনদের আহাজারি। ছবি: সমকাল
ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:২৯ | আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২১:০৯
‘আগুন লাগার পর স্বামীকে কাঁধে করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলাম। হঠাৎ পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে আমাদের ফেলে দেওয়া হয়। আমি সিঁড়িতে পড়ে জ্ঞান হারাই। পরে জ্ঞান ফিরে শুনি, আমার স্বামী মারা গেছেন।’
কথাগুলো বলছিলেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুন লাগার ঘটনায় নিহত ফুলবাড়িয়ার পল্লিচিকিৎসক শাহজাহান মোল্লার স্ত্রী হারিছা বেগম। মঙ্গলবার সকালে ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর গ্রামের বাড়িতে স্বামীর মরদেহের পাশে বিলাপ করছিলেন তিনি।
হারিছা বেগম বলেন, সোমবার সন্ধ্যায় হাসপাতালে আগুন লাগার পর চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তখন আমি ও বড় বোন জাহানারা মিলে শাহজাহানকে কাঁধে করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলাম। এ সময় পেছন থেকে ধাক্কা এলে সিঁড়িতে পড়ে যাই।
তিনি বলেন, ‘আমি নিজেও আঘাত পেয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমার বোনও আহত হয়। পরে জ্ঞান ফিরে শুনি, আমার স্বামী মারা গেছে। তখনও মানুষ আমাদের ওপর দিয়েই চলে যাচ্ছিল।’
পরিবারের সদস্যদের দাবি, হুড়োহুড়ির মধ্যে পদদলিত হয়েই শাহজাহান মোল্লার মৃত্যু হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ভিন্ন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও বিভাগীয় কমিশনারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগুনের ঘটনায় কেউ পদদলিত হয়ে মারা যাননি। যে দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে, তাদের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বলে জানানো হয়।
তবে নিহতদের স্বজনেরা এ বক্তব্য মানতে নারাজ। তাদের দাবি, আগুনের পর আতঙ্ক ও হুড়োহুড়ির কারণেই তাদের স্বজনদের মৃত্যু হয়েছে।
শাহজাহান মোল্লার মৃত্যুর বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের সমালোচনা করেন তার স্ত্রী হারিছা বেগম। তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, কেউ পদদলিত হয়ে মারা যায়নি। তারা তো ঘটনাটি দেখেনি। আমি সেখানে ছিলাম। আমি দেখেছি কী হয়েছে।’
শাহজাহান মোল্লার পাশাপাশি একই ঘটনায় ফুলবাড়িয়ার সিএনজিচালক রমজান আলী এবং তারাকান্দার কুলসুম বেগমও মারা গেছেন। তাদের মরদেহ নিজ নিজ বাড়িতে নেওয়ার পর দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
সিএনজিচালক রমজান আলীর স্ত্রী খাদিজা আক্তারের দাবি, আগুনের ঘটনা না ঘটলে এবং আতঙ্ক তৈরি না হলে তার স্বামী হয়তো বেঁচে যেতেন। তিনি বলেন, ‘আগুন লাগার পর তাড়াহুড়ো করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তিনি। এরপর সেখানেই নিস্তেজ হয়ে পড়ে যান। কয়েকজনের সহযোগিতায় তাকে ওপরে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’
‘হাসপাতালে আগুন না লাগলে, আতঙ্কিত না হলে আমার স্বামী হয়তো বেঁচে যেতেন’, বলেন তিনি।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বেশ কিছুদিন ধরে বুকে ব্যথা নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন রমজান আলী। সোমবার সন্ধ্যায় হাসপাতালে আগুন লাগার পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন রমজান। পরে আতঙ্কিত হয়ে মারা যান তিনি।
এদিকে এই ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।