ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ ধরা

পদ্মা-যমুনার চরাঞ্চলে মৌসুমি জেলেদের প্রকাশ্য প্রস্তুতি

শিবালয়ের আরিচা বাজারে অবাধে কারেন্ট জাল বিক্রি

পদ্মা-যমুনার চরাঞ্চলে মৌসুমি জেলেদের প্রকাশ্য প্রস্তুতি
×
×

নিরঞ্জন সুত্রধর, শিবালয় (মানিকগঞ্জ)

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

ইলিশের নিরাপদ প্রজননের লক্ষ্যে আগামী ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন সারাদেশে ইলিশ মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকবে। সরকারের এ ঘোষণায় পেশাদার জেলেরা জাল গুটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অন্যদিকে পদ্মা-‍যমুনার চরাঞ্চলে বাড়ছে মৌসুমি জেলেদের তোড়জোড়। নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ আহরণে নামতে তারা জাল ও নৌকা প্রস্তুতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। স্থানীয়রা বলছেন, প্রকাশ্যে তারা এমন প্রস্তুতি নিলেও প্রশাসনের কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার পদ্মা-যমুনা নদীর চরাঞ্চলে প্রতিবছরই ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ সময়ে মৌসুমি জেলেদের অপতৎপরতা বেড়ে যায়। স্থানীয় পেশাদার জেলেরা জানিয়েছেন, এবারও চরগুলোয় জাল ও নৌকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। নদীতে মা ইলিশ আসা শুরু হলেই মৌসুমি জেলেরা নৌকা ও জাল নিয়ে নদীতে মাছ ধরতে নেমে পড়বেন। এই মৌসুমি জেলেরা বছরের অন্য সময় নানা পেশায় নিযুক্ত থাকেন। শুধু ইলিশ ধরার নিষিদ্ধ সময়ে তারা অন্য কাজ ছেড়ে দিয়ে মাছ ধরতে নেমে পড়েন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, শিবালয়ের চরাঞ্চল বিশেষ করে, ঢালা মালচি, আলোকদিয়া, চর শিবালয়, জাফরগঞ্জ, বাগুটিয়া, তেওতা, হেমগঞ্জ বাজারের মৌসুমি জেলেরা এখন পুরোদমে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সপ্তাহ দুয়েক আগে থেকে তারা জাল কেনা ও বিশেষ ধরনের নৌকা প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাতে জানা গেছে, এসব চরাঞ্চলে প্রায় দেড় হাজার মৌসুমি জেলে রয়েছেন। তাদের অনেকে নতুন নৌকা বানিয়ে তাতে মোটর বসিয়েছেন। অনেকে আগের নৌকা মেরামত করেছেন, নতুন করে আলকাতরা লাগিয়েছেন। তাদের এ নৌকা আকারে সরু ও লম্বা হয়। 
মা ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ সময়ে নদী তীরবর্তী এসব এলাকায় দেদার ইলিশ মাছ বিক্রি করা হয়। ওই সময়ে আলোকদিয়ায় বসে সবচেয়ে বড় বাজার। গত বছর অভিযানে যাওয়া প্রশাসনের লোকজনের ওপর মৌসুমি জেলেদের হামলার ঘটনাও ঘটে।

মা ইলিশ ধরার জন্য কারেন্ট জাল সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় আরিচা বাজারে। এখান থেকেই উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলের বাজারে জাল পাঠানো হয়। ফরহাদ মোল্লা, ইছাক শেখসহ পাঁচ-ছয়জন এ জাল বিক্রি করছেন। জানতে চাইলে আরিচা বাজারের কারেন্ট জল বিক্রেতা ইছাক শেখ বলেন, আমার কাছে এ জাল নেই। আমি এটা বিক্রি করি না। অন্য জাল ব্যবসায়ীদের কাছে থাকতে পারে। তিনি জানান, সাধারণত ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকা কেজি দরে কারেন্ট জাল বিক্রি হয়।

জাফরগঞ্জ এলাকার পেশাদার জেলে রাম হালদার বলেন, মা ইলিশ ধরা নিষিদ্ধের সময়ে আমরা নদীতে নামি না। নদী তীরবর্তী এলাকার মৌসুমি জেলেরা মাছ মারার জন্য নতুন জাল, দড়ি ও নৌকা রেডি করছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন মৌসুমি জেলে বলেন, প্রশাসন অভিযানে আসার আগেই তারা খবর পেয়ে যান। মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের পাশের বিভিন্ন চায়ের দোকানে তাদের সোর্সরা অবস্থান করে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্র বলছে, অভিযানে আটক জেলেদের ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য কিছু জনপ্রতিনিধিসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তদবির করেন। এ কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সমস্যায় পড়তে হয়। অনেক সময় দেখা গেছে, অভিযানে আটককৃত জেলেদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কিছু টাকা জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়া হয়। ছাড়া পাওয়া জেলেরাই আবার নদীতে মা ইলিশ ধরতে নামেন। এরকমভাবে একই মৌসুমি জেলে বার বার আটক হয়েছেন গত বছর।

স্থানীয়রা বলছেন, অভিযানে আটক জেলেদের ছেড়ে না দেওয়া এবং আটককৃত মাছ ধরার নৌকাগুলো জব্দ করে ভেঙে ফেলা হলে নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ মাছ ধরা অধিকাংশেই কমে আসবে।
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, গত বছর মা ইলিশ ধরা রোধে ২২টি ভ্রাম্যমাণ আদালত, ৭১টি অভিযান পরিচালনা, ৪৯টি মৎস্য আড়ত পরিদর্শন, ১৩৯টি বাজার পরিদর্শন করা হয়।  ২৮৭ কেজি জাটকা ইলিশ জব্দ, তিন লাখ ৪৫ হাজার কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়। ১৪ জন জেলেকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাদণ্ড ও দুই লাখ ১১ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। 
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাথী রানী নিয়োগী বলেন, এবার কাউকে নদীতে মা ইলিশ ধরতে দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, আমাদের অফিসে লোকজন কম থাকায় অনেক সময় সমস্যায় পড়তে হয়। তবে গত এক মাসে প্রায় অর্ধকোটি টাকা মূল্যের কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।
ইউএনও মনীষা রানী কর্মকার বলেন, প্রতিবছরের মতো এবারও কঠোরভাবে অভিযান পরিচালনা করে মা ইলিশ ধরা বন্ধ করা হবে।

আরও পড়ুন

×