ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

ডিলারের কাছে নেই, কৃষক ছুটছেন সারের খোঁজে

ডিলারের কাছে নেই, কৃষক ছুটছেন সারের খোঁজে
×
×

ছবি: সমকাল ইপেপার

শেখ হারুন অর রশিদ, কয়রা (খুলনা)

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:৩৩ | আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

চলতি আমন মৌসুমে ১০ বিঘা জমি চাষাবাদ করেন খুলনার কয়রা উপজেলার কৃষক তৌহিদুল সানা। তাঁর বাড়ি উপজেলার আমাদি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে। প্রথম দফায় জমিতে দেওয়ার জন্য তাঁর ১০০ কেজি ইউরিয়া সারের প্রয়োজন ছিল। ৪০ কেজি কেনার পর স্থানীয় ডিলারের কাছে গিয়ে আর সার পাননি। গত শুক্রবার সারের জন্য তিনি যান ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ডিলারের কাছে। কিন্তু সেখানেও একই অবস্থা। 

বিভিন্ন দোকান ঘুরে সার না পেয়ে তৌহিদুল সানা যোগাযোগ করেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়ে। সেখান থেকে তাঁকে জানানো হয়, চলতি মাসে উপজেলার জন্য সারের বরাদ্দ পাস না হওয়া পর্যন্ত এই সংকট কাটবে না। এমন সংকটে পড়েছেন উপজেলার বেশির ভাগ কৃষক। এ কারণে চলতি মৌসুমে আমনে আশানুরূপ ফলন নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা।

গতকাল শনিবার কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। তাঁকে কৃষকেরা জানান, চাহিদা অনুযায়ী সার দিতে পারছেন না বিক্রেতারা। কৃষকদের চাপে অনেক খুচরা বিক্রেতা দোকান বন্ধ করে গাঢাকা দিচ্ছেন। অপরদিকে খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী তাদের সার সরবরাহ করতে পারছেন না ডিলারেরা। 

হাতিয়ারডাঙ্গা বাজারের খুচরা বিক্রেতা আশিষ রায়ের ভাষ্য, স্থানীয় কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী দিনে তাঁর প্রয়োজন ১০০ বস্তা ইউরিয়া সার। কিন্তু তিনি পাচ্ছেন মাত্র ২০-২৫ বস্তা। এতে কৃষকের চাপে পড়ছেন। বাধ্য হয়ে মাঝেমধ্যে দোকান বন্ধ রাখতে হচ্ছে তাঁকে। 

ওই এলাকার কৃষক শাহ আলম বলেন, ‘গত তিন দিন ধরে এলাকার দোকানে দোকানে ঘুরতেছি। কিন্তু কারও কাছে সার পাচ্ছি না। পরে পাশের উপজেলার একটি দোকান থেকে বেশি দাম দিয়ে সার কিনতি হয়েছে।’

একই রকম তথ্য দেন মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের নয়ানি এলাকার কৃষক নিরোদ মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘২০ বিঘা জমির সার জোগাড় করতি চোখে অন্ধকার দেখতি হচ্ছে। এলাকার কোনো দোকানে চাহিদামতো সার মিলছে না। উপায় না দেখে কয়েকজন মিলে একটি ট্রলার ভাড়া করে অন্য উপজেলা থেকে চড়া দামে সার আনতি হয়েছে। এভাবে কতদিন চলবে বুঝতিছে না।’ দ্রুত সময়ের মধ্যে সারের সংকট নিরসনের দাবি এই কৃষকের।

বাগালি ইউনিয়নের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক খুচরা বিক্রেতা বলেন, এলাকায় সারের সংকট থাকলেও আশপাশের কয়েকটি উপজেলা থেকে সার কিনতে পারছেন তারা। সেই সারের দাম পড়ছে বেশি। বাধ্য হয়ে অনেক কৃষকের কাছ থেকেও বেশি দাম রাখতে হচ্ছে। সংকট কাটাতে এ উপজেলায় বরাদ্দ বাড়ানোর বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি। 

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্র জানায়, কয়রায় চলতি মৌসুমে ১৬ হাজার হেক্টর জমিতে আমনের চাষ হয়েছে। সেপ্টেম্বরে সাতজন সার ডিলারের অনুকূলে ইউরিয়া বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৫৩০ টন। এ ছাড়া ডিএপি ৩৫০ টন, এমওপি ১১৫ টন ও টিএসপি বরাদ্দ হয়েছে ৬ টন। এর মধ্যে দুই কিস্তিতে বরাদ্দ সার তুলে নিয়েছেন ডিলারেরা। চাষাবাদের জমি ও কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সারের বরাদ্দ কম বলেও স্বীকার করেন কর্মকর্তারা।  

একাধিক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যমতে, কয়রার সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে এই মুহূর্তে আমাদি, বাগালি ও মহেশ্বরীপুরে সারের সংকট বেশি। এই তিন ইউনিয়নের ডিলারের কাছে মজুত নেই বললেই চলে। এসব ইউনিয়নের কৃষকেরা সারের জন্য তাদের কাছে এসেও ধরনা দিচ্ছেন। অন্য চার ইউনিয়নেও সারের সংকট রয়েছে। 

উপজেলা সার পরিবেশক সমিতির সভাপতি আবুল হাসানের ভাষ্য, গত বছরের তুলনায় এবার আমন মৌসুমে সার বরাদ্দ বেশি হলেও সংকট দেখা দিয়েছে। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, গত বছর চাহিদা মেটাতে অন্য জায়গা থেকে সার কিনে ঘাটতি পূরণ করা হয়েছিল। কিন্তু এবার সে সুযোগ নেই। সরকারের কঠোর নজরদারিতে কালোবাজারি বন্ধ হয়ে গেছে। যে কারণে ঘাটতি দেখা দিয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। 

কয়রা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তিলোক কুমার ঘোষ বলেন, আমনের ভরা মৌসুমে যে পরিমাণ সার বরাদ্দ পাওয়া গেছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে সরকার নির্ধারিত দামে সার পাওয়া গেলেও চাহিদা অনুযায়ী পাচ্ছেন না কৃষকেরা। এ জন্য তারা অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। চাহিদা মেটাতে বরাদ্দ বাড়ানো ও বর্তমান ঘাটতি মেটাতে উপবরাদ্দের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছেন। 

আরও পড়ুন

×