ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

‘জলে বাস করে কুমিরের সাথে লড়াই না করাই ভালো’

‘জলে বাস করে কুমিরের সাথে লড়াই না করাই ভালো’
×
×

ফরিদপুর অফিস

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ২০:২৮ | আপডেট: ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | ২০:৩২

ইউসুফ ফকির (৪৭) হত্যাকাণ্ডের আড়াই মাস হতে চলেছে। এ ঘটনায় স্বজনেরা ফরিদপুর আদালত ও কোতোয়ালি থানায় পৃথক মামলা করেছেন। এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। উল্টো মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি দিচ্ছেন প্রধান আসামি। আজ সোমবার দুপুরে ফরিদপুর প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এমন অভিযোগ করেছেন ইউসুফের স্ত্রী বেদেনা আক্তার। তিনি জানিয়েছেন, অব্যাহত হুমকিতে ছেলেমেয়েকে নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তাই জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে লড়াই না করাই ভালো।

সদর উপজেলার চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের লোকমান খাঁর ডাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন ইউসুফ ফকির। একই ইউনিয়নের মমিনখাঁর হাটে ট্রান্সপোর্টের ব্যবসা করতেন। গত ১৬ জুলাই সন্ধ্যায় অটোরিকশায় করে বাড়ির সামনে আসেন ইউসুফ। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই নিখোঁজ হন। ১৮ জুলাই সকালে বাড়ির অদূরে একটি পাটখেতে ইউসুফকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় দেখতে পায় স্থানীয় লোকজন। স্বজনেরা মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পরদিনই এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন তাঁর স্ত্রী বেদেনা আক্তার।

মামলায় কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় গত ৯ সেপ্টেম্বর ফরিদপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের ১ নম্বর আমলী আদালতে ৭ জনের নাম উল্লেখসহ ৫-৬ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করে হত্যা মামলা করেন বেদেনা। প্রধান আসামি হিসেবে তিনি নাম উল্লেখ করেন চরমাধবদিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম আজমের (৫৮)। এ ছাড়া আজমের ছেলে রাব্বী বেপারি (৩২) ও রবিন বেপারিকেও (৩০) আসামি করা হয়।

আজ বেদেনা আক্তার অভিযোগ করেন, কোতোয়ালি থানায় মামলা করার পর তদন্তের সময় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহামুদুল হাসান তাদের ডেকে নিয়ে হুমকি দেন। ওসি তাদের বলেন, ‘জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে লড়াই না করাই ভালো।’ এ ছাড়া তদন্ত চলাকালে পুলিশ ভয়ভীতি দেখিয়ে হয়রানি করে বলেও অভিযোগ তাঁর। এ জন্য ন্যায়বিচার চেয়ে তিনি আদালতে মামলা করেন।

মামলায় বিএনপি নেতা ও তাঁর দুই ছেলের নাম উল্লেখের কারণ হিসেবে বেদেনা আক্তার বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে আসামিরা এলাকায় চাঁদাবাজি শুরু করেন। তাঁর স্বামী মমিনখাঁর হাটে ব্যবসা করায় আজমের ছেলে রাব্বিকে প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা দিতেন। এক পর্যায়ে আজম নিজেও এককালীন পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন। এক মাসে চাঁদা না দেওয়ায় তাঁরা ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ারও হুমকি দেন। এসব নিয়ে নিখোঁজ হওয়ার দুইদিন আগে সাইফুল ইসলাম আজমের সঙ্গে তাঁর স্বামীর বাগবিতণ্ডা হয় জানিয়ে বেদেনা বলেন, ‘এর দুইদিন পরেই আমার স্বামী নিখোঁজ হয়ে যান। তাঁদের (আসামি) বাড়ির পেছনে পাটখেতে পাওয়া যায়।’

সংবাদ সম্মেলনে বেদেনার সঙ্গে ছেলে শাহাদাত হোসেন (১৫), মেয়ে ইলমা আক্তারসহ (১০) স্বজনেরা উপস্থিত ছিলেন। তিনি আরও বলেন, বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম আজমসহ অন্য আসামিরা মামলা তুলে নেওয়ার জন্য তাঁদের হুমকি দিচ্ছেন। ছোট দুই সন্তান নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় আছেন। মমিনখাঁর হাটে তাঁর যেসব স্বজনের ব্যবসা রয়েছে, তাদেরও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সামাজিক মাধ্যমে যারা প্রতিবাদ করেন, তাঁদেরও ইউসুফের পরিণতির কথা মনে করিয়ে হুমকি দিচ্ছেন তারা। 

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সাইফুল ইসলাম আজম বলেন, ‘আমি কেন তাদের হুমকি দিতে যাব? প্রশ্নই আসে না। আর চাঁদা নেবো কেন? ওতো (নিহত ইউসুফ) ছোটখাটো ব্যবসায়ী, ওর চেয়ে এই বাজারের বড় বড় ব্যবসায়ী আছে, কারও এক টাকা চাঁদা দেওয়া লাগে না।’ তিনি দাবি করেন, ইউসুফের পরিবারের সঙ্গে অনেক আগের সালিশের বিষয়ে বিরোধ রয়েছে। সেই ক্ষোভ ও প্রতিপক্ষের ইন্ধনে তাঁকে মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে মনে করেন। 

ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ওসি মো. মাহামুদুল হাসানের ভাষ্য, থানায় করা মামলাটি দেড় মাস আগেই সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। আদালতে করা মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। থানায় করা মামলাটিরও গুরুত্ব রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশ ব্যবস্থা নেবে। মামলার পর বাদীপক্ষকে ডেকে হুমকির বিষয়ে তাঁর ভাষ্য, এসব উল্টাপাল্টা কথাবার্তার কোনো মানে হয় না। 

এদিকে সংবাদ সম্মেলনের সময় কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মামুনুর রশিদের নেতৃত্বে পুলিশের ৫-৬ সদস্য প্রেস ক্লাবে যান। তারা সংবাদ সম্মেলন সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। এ বিষয়ে ওসির দাবি, নিয়মিত ডিউটির অংশ হিসেবে তারা গিয়েছেন।

আরও পড়ুন

×