পাচারের সার আটকাতে গিয়ে কারাগারে গেলেন কৃষক
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রাম থেকে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে সার বহনকারী চারটি ট্রাক আটকানোর ঘটনায় এক কৃষক কারাগারে গেছেন। একটি চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে গতকাল বুধবার আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
যদিও মামলার বাদী বলেছেন, তিনি এই মামলায় আনা অভিযোগ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তিনি এজাহারে শুধু সই করেছেন। ওই কৃষক তাঁর কাছে কোনো চাঁদাও চাননি।
ভুক্তভোগী কৃষকের নাম আইয়ুব আলী। তিনি সীতাকুণ্ড উপজেলার মুরাদপুর ইউনিয়নের গুলিয়াখালী গ্রামের বাসিন্দা এবং ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সভাপতি। তিনি চট্টগ্রাম বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কৃষক হিসেবে স্বীকৃতপ্রাপ্ত।
ঘটনা সম্পর্কে কৃষক আইয়ুব আলীর স্ত্রী ফাতেমা মনি গতকাল বিকেলে সমকালকে বলেন, গত মঙ্গলবার দুপুরে চারটি ট্রাকে করে সারগুলো সীতাকুণ্ডের গুলিয়াখালী নৌঘাটের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। এর আগেও কয়েকবার এ ঘাট হয়ে সার পাচার হয়েছে। পাচারের বিষয়টি বুঝতে পেরে তাঁর স্বামী তা উপজেলা কৃষি দপ্তরে জানান। তখন তাঁকে সারগুলো আটকাতে বলা হয়। এরপর তিনি সার বহনকারী ট্রাকগুলো গুলিয়াখালী এলাকায়
আটকান।
ফাতেমা মনি বলেন, এক পর্যায়ে ট্রাকচালকদের কাছে সারের বিভিন্ন ডকুমেন্ট চান তাঁর স্বামী। কিন্তু তারা ডকুমেন্ট দেখাতে পারেননি। এরপর তাঁর স্বামী ট্রাকের চাবি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এরমধ্যে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের কর্মকর্তা ইশতিয়াক আহমেদের নেতৃত্বে একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এর কিছুক্ষণ পরে ঘটনাস্থলে আসে পুলিশের একটি দলও।
ক্ষুব্ধ কণ্ঠে আইয়ুব আলীর স্ত্রী সমকালকে বলেন, ‘আমার স্বামী বিনা অপরাধে চাঁদাবাজি মামলায় কারাগারে গেল। এর প্রতিকার কার কাছে চাইব?’
সীতাকুণ্ড উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের সহকারী কর্মকর্তা ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, ‘চারটি ট্রাকে করে সার নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি কৃষক আইয়ুব আলী মাঠ পর্যায়ে সহকারী কর্মকর্তা তন্ময় ভট্টাচার্যকে জানান। তিনিই (তন্ময়) সারভর্তি ট্রাকগুলো আটকানোর জন্য বলেন। এরমধ্যে তারাও দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছান। ট্রাকচালকরা সার নিয়ে যাওয়ার কোনো ডকুমেন্ট দেখাতে পারেননি। সেখানে চাঁদাবাজির কোনো বিষয় ছিল না।
কৃষি কর্মকর্তা ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, তারা পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পর সীতাকুণ্ড থানার এসআই শফিউল করিমের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে আসে। তারা কৃষক আইয়ুব আলীর সঙ্গে তর্কে জড়ান। এক পর্যায়ে তারা হাতকড়া পরিয়ে কৃষককে থানায় নিয়ে যান। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ট্রাকচালক ও সার ক্রেতার লোকজন ছিল।
কৃষক আইয়ুব আলীর বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী হলেন ট্রাকচালক মোহাম্মদ পাবেল। তিনি সমকালকে বলেন, ‘কৃষক আইয়ুব আলী আমার কাছে কোনো চাঁদা চায়নি। কিন্তু গাড়ির চাবি নিয়ে নিতে চাইছিল। নিতে পারেনি।’ তাহলে মামলায় চাঁদাবাজির বিষয়টি এলো কীভাবে, প্রশ্নে তিনি বলেন, এ বিষয়টি তাঁর জানা নেই। পুলিশ এজাহার লিখে দিয়েছে, তিনি শুধু সই করেছেন।
এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড মডেল থানার এসআই মো. শফিউল করিম দাবি করেছেন, সারগুলো গুলিয়াখালী ঘাটঘর দিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় কৃষক আইয়ুব আলী ও আলমগীর নামের স্থানীয় এক ব্যক্তি ট্রাকচালকের কাছে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। এক পর্যায়ে আদালতের কাগজপত্র দেখানোর পর ২০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন তারা। তাদের মধ্যে কৃষক আইয়ুব আলীকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
এসআই জানান, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী জব্দ সার নিলামে তোলা হয়েছিল। সন্দ্বীপের বাসিন্দা মো. ফখরুল ইসলাম এই সার পেয়েছেন।
ঘটনার সময় কৃষক আইয়ুব আলীর সঙ্গে আলমগীর নামের আরও এক স্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু পুলিশ যাওয়ার আগে ঘটনাস্থল থেকে তিনি সরে যান বলে জানান স্থানীয়রা।
মিয়ানমারে সার পাচারে নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে বঙ্গোপসাগরের সীতাকুণ্ড-সন্দ্বীপ চ্যানেল। এর মধ্যে সীতাকুণ্ডের চারটি স্পট হলো– কুমিরা, বাঁশবাড়িয়া, গুলিয়াখালী ও বাড়বকুণ্ড। উপজেলা কৃষি দপ্তরের তথ্যমতে, গত সেপ্টেম্বরে দুই দফায় এক হাজার ৩৫০ বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সার ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৬ অনুযায়ী, নিবন্ধন ছাড়া সার উৎপাদন, আমদানি, সংরক্ষণ, বিতরণ, বিপণন, পরিবহন বা বিক্রয়
করা যায় না।
- বিষয় :
- কৃষক