অনৈতিক সম্পর্কের অপবাদ দিয়ে গৃহবধূর হাত ধরেন একজন, অন্যজন কাটেন চুল
গৃহবধূর চুল কাটছেন দুজন
সদরপুর (ফরিদপুর) সংবাদদাতা
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬:৪৮ | আপডেট: ১২ অক্টোবর ২০২৬ | ১৬:৫১
ফরিদপুরের সদরপুরে অনৈতিক সম্পর্কের অপবাদ দিয়ে এক গৃহবধূকে (৩৫) আটকে রেখে মারধর ও চুল কেটে দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসা এক যুবককে (৩০) গাছে বেঁধে নির্যাতন করা হয়। গত রোববার সকালে উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী গৃহবধূর স্বামী মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী। নির্যাতনের শিকার যুবক তাঁর শ্বশুরবাড়ির প্রতিবেশী। নির্যাতনে নেতৃত্ব দেওয়া সুমন হোসেন ও জয় হোসেন একই এলাকার মাতুব্বর ইউসুফ বেপারির নাতি। ইউসুফ বেপারি আগামী ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করতে চান।
এ ঘটনার দুটি ভিডিও রোববার রাতে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, একটি চেয়ারে বসিয়ে এক যুবক গৃহবধূর হাত ধরে রেখেছেন, অন্য যুবক কাঁচি দিয়ে চুল কেটে দিচ্ছেন। এ সময় ভুক্তভোগী চিৎকার করলেও চুল কাটা বন্ধ হয়নি। ভিডিওর একপর্যায়ে তাঁকে চড় মারতেও দেখা যায়। অপর ভিডিওতে ওই যুবককে রাতে গাছে দড়ি দিয়ে বেঁধে মারধর করতে দেখা গেছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, গত শনিবার ওই গৃহবধূ বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে আসেন। সেদিন রাতে প্রতিবেশী যুবক (৩০) তাঁর কক্ষে যাওয়ার পরই শ্বশুরবাড়ির লোকজন বাইরে থেকে দরজা আটকে দুজনকে বন্দী করেন। গৃহবধূর চুল কেটে দেওয়ার পর পরদিন বিকেলে বাবার বাড়ির লোকজনের কাছে ও যুবককে স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মেয়ের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন জানিয়ে গৃহবধূর বাবা বলেন, ‘আমার মেয়েকে শ্বশুর-শাশুড়ি পছন্দ করেন না। তাঁরা প্রায়ই নির্যাতন করতেন।’ যে যুবককে নির্যাতন করা হয়, তাঁর কাছে তিনি পাঁচ হাজার টাকা পান। টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য তিনি গিয়েছিলেন। এ সময় তাদের আটকে নির্যাতন চালানো হয় জানিয়ে তিনি বলেন, সেই দৃশ্য ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে তাঁর মেয়ের সম্মানহানি হয়েছে। সে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় তারা মামলা করবেন বলেও জানান।
ওই নারীর শ্বশুর ও শাশুড়ির অভিযোগ, তাদের পুত্রবধূ মাদক সেবন করেন। তাঁর একাধিক পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। দুজনকে হাতেনাতে আটক করা হলে এলাকাবাসী যুবককে মারধর করে ও গৃহবধূর চুল কেটে দেয়।
তবে ভুক্তভোগী নারী বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তুলে আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। শ্বশুর-শাশুড়ি মিলে ঘটনা সাজিয়েছেন। আমার চুল কেটে দেওয়া হয়েছে। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।’
নির্যাতনের শিকার যুবকের ভাষ্য, ‘আমি টাকা ফেরত দিতে ভাবির কাছে গিয়েছিলাম। হঠাৎ ঘরের দরজা বন্ধ করে আমাদের আটকে রাখা হয়। পরে আমাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে মারধর করা হয়। উনার সঙ্গে আমার কোনো অবৈধ সম্পর্ক নেই। আমরা মাদকও সেবন করিনি।’
নির্যাতনে নেতৃত্ব দেওয়া সুমন হোসেন ও জয় হোসেনকে বাড়িতে গিয়ে পাওয়া যায়নি। তাদের দাদা ইউসুফ বেপারি বলেন, খবর পেয়ে তিনি ওই বাড়িতে যান। পরদিন মেয়েকে বাবার কাছে ও ছেলেটিকে তাঁর বাবার কাছে বুঝিয়ে দেন। তিনি বলেন, গৃহবধূর বাড়িতে বিভিন্ন লোকের যাতায়াতের অভিযোগ আছে। তবে চুল কাটার সময় তিনি সেখানে ছিলেন না।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি জানতে পারেন সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আল মামুন শাহ। এখনো লিখিত অভিযোগ পাননি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কেউ অপরাধ করলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া আইনবিরোধী কাজ। এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়।’
কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে পরকীয়া, মাদক সেবন কিংবা অন্য কোনো অপরাধের অভিযোগ থাকলেও তাঁকে আটকে নির্যাতনের অধিকার কারও নেই বলে জানান ফরিদপুর জজ কোর্টের আইনজীবী তুহিন মৃধা। তিনি বলেন, এমন ঘটনায় ভুক্তভোগীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। অপরাধের ধরন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কোনো অভিযোগ থাকলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে হবে। আইনগত প্রক্রিয়ায় বিচার চাইতে হবে। কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না।
- বিষয় :
- ফরিদপুর